একটি ছোট্ট গ্রাম: আশির দশকে ভারতে সুনামি তুলেছিল
তিনশো পরিবারের একটি গ্রাম। একটি সিদ্ধান্ত। পরিবর্তন করে দিয়েছিল একটি দেশের রাজনৈতিক গতিধারা। বদলে দিয়েছিল বহুকাল ধরে চলে আসা সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের রীতি। তৈরি হয়েছিল অসংখ্য কন্সপিরেসি (বানোয়াট ষড়যন্ত্রতত্ত্ব)। যার রেশ আজও ভারতের মিডিয়া, সাহিত্য ও রাজনৈতিক দর্শনে পরিলক্ষিত হয়। ঘটনাটি জন্ম দিয়েছিল বিভিন্ন সংগঠনের। আয়োজিত হয়েছিল বিশাল জনসভা। গল্পটা মীনাক্ষীপুরাম গ্রামের। দক্ষিণ তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলা। পশ্চিমাঞ্চলের তেঙ্কাসি তালুকের একটি গ্রাম মীনাক্ষীপুরাম।
ঈশ্বরের যেই ঠ্যাং অস্পৃশ্য-
দক্ষিণ ভারতের কোন এক অজপাড়া গাঁয়ে। রাতের প্রথমাংশ। কৃষ্ণ দেহের এক মা। শুদ্র হরিজন। তার ছোট্ট ছেলেকে গল্প শুনাচ্ছে। মিষ্টি চাঁদের জোছনা আলোয়। প্রাম্মান বা ব্রহ্মার মহাবিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে। সমগ্র জীবনে শেখা একমাত্র ঝগ্বেদের শ্লোক আবৃত্তি করলেন তিনি। সংস্কৃত ভাষায়। ঈশ্বর তার মুখমণ্ডল থেকে ব্রাহ্মণদের সৃষ্টি করেছেন। ক্ষত্রিয়দের তার বাহু থেকে। নিজের উরু থেকে বৈশ্যদের। আর শূদ্রদের নিজের পা থেকে।
ছেলেটি মায়ের দিকে কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বসলো, "আম্মা, কাদাভুলিন পাদাংগল অসুথ্থমানাভায়া? অসুথ্থমিল্লাই এনড্রাল নাম্মা এন থিন্ডাথ্থাগাথাভার্গুলো?"
("মা, ঈশ্বরের পা কি অপবিত্র? অপবিত্র না হলে আমরা অস্পৃশ্য কেন?")
স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের শ্রেণী বিভাজন শুধু প্রাচীন আর্য সভ্যতায় না, চীনা সভ্যতা এবং গ্রিক সভ্যতায়ও দেখা যায়। তবে এটাকে ধর্মীয় রূপ দিয়ে স্রষ্টার সাথে সম্পৃক্ত মনে হয় শুধু আর্যরাই করেছিল। আর্যদের মতো প্রাচীন চীনে দার্শনিক কনফুসিয়াসের চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে সমাজে মানুষের কাজ ও মর্যাদার ভিত্তিতে একটি চার স্তরবিশিষ্ট সামাজিক শ্রেণিবিভাগ গড়ে ওঠে। যাকে Four Occupations বলা হয়।
১. শি (Shi) — পণ্ডিত ও শাসক শ্রেণি (Scholars/Gentry)
২. নোং (Nong) — কৃষক শ্রেণি (Peasant Farmers)
৩. গোং (Gong) — কারিগর ও শিল্পী (Artisans/Craftsmen)
৪. শাং (Shang) — ব্যবসায়ী শ্রেণি (Merchants/Traders)
আবার গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য রিপাবলিক'-এ একটি আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা দিতে গিয়ে সমাজকে ভাগ করেন তিনটি শ্রেণীতে।
১. দার্শনিক বা শাসক শ্রেণি (Philosopher, Kings)
২. সৈনিক বা রক্ষী শ্রেণি (Auxiliaries, Guardians)
৩. উৎপাদক শ্রেণি (Producers, Craftsmen)
মজার ব্যাপার হলো, বিভাজনকারীরা কেউ নিজেদের প্রথম স্তরের পরের স্তরে রাখেননি! দার্শনিক প্লেটো সমাজকে এই শ্রেণিবিভাগ মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য একটি ধারণার কথা বলেছিলেন, যা 'মিথ অব দ্য মেটালস' নামে পরিচিত। তিনি বলেছিলেন, "ঈশ্বর মানুষের আত্মায় বিভিন্ন ধাতু মিশিয়ে দিয়েছেন। শাসকদের আত্মায় সোনা। সৈনিকদের আত্মায় রূপা। আর কৃষক ও কারিগরদের আত্মায় ব্রোঞ্জ বা লোহা।" অর্থাৎ এই বিভাজন স্রষ্টা প্রদত্ত রূপরেখায় সৃষ্ট। ঠিক একই কাজ করেছে আর্যরা।
প্লেটো ধর্মীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করলেও তার ছাত্র অ্যারিস্টটল সে পথে এগোননি। তিনি সমাজকে অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে ভাগ করেছিলেন। যেই বিভাজনের প্রয়োগ বর্তমানে সচরাচর বিশ্বরাজনীতিতে দেখা যায়। আমরা যদি আর্যদের শ্রেণীবিভাগ সামনে রাখি তবে দেখতে পাই আর্যদের শ্রেণীবিভাগের প্রথম এবং দ্বিতীয় স্তর প্লেটো এবং চীনা সভ্যতার প্রথম স্তরের সাথে প্রায় হুবহু একই। চীনা সভ্যতার শী(Shi) স্তরেই ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়দের অবস্থান। বাকিগুলো মিলে বৈশ্য। তাহলে শূদ্র কোথায়? শূদ্রদের বিভাজন আমি আর্যদের ছাড়া কোথাও খুঁজে পাইনি। ঈশ্বরের পা থেকে সৃষ্ট এই শূদ্ররা কারা এবং কেন এই শ্রেণীর সৃষ্টি আমরা সেটাই খোঁজার চেষ্টা করবো।
শূদ্র বা চণ্ডাল। মহাত্মা গান্ধী যাদের নাম দিয়েছিলেন হরিজন। ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম তার বইতে শূদ্রদের আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, "...... এরা অনেকটা দাস শ্রেণীভুক্ত। হয়ত পরাজিত ও দাসে পরিণত দ্রাবিড়গণ আর্যদের দ্বারা এভাবে শূদ্র বলে পরিগণিত হয়।..."
ঋগ্বেদ এই শ্রেণীবিভাজনের মূল উৎস হলেও মনুস্মৃতিতে এর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ তুলে ধরে প্রত্যেক শ্রেণীর আলাদা দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। যেগুলো মূলত বিজয়ী আর্যরা তৈরি করেছিল পরাজিতদের সম্মানজনক স্বাধীন জীবনযাপনের অভিলাষ মুছে দেওয়ার জন্য। শূদ্রদের প্রতি আর্যদের ঘৃণার নমুনা হিসেবে তাদের প্রণীত কিছু নিয়মের উল্লেখ করার হলো:
১. চণ্ডাল তথা শূদ্রশ্রেণীর লোকেরা শহরের বাইরে বসবাস করবে।
২. শুধু নিজেদের মধ্যেই লেনদেন করতে পারবে।
৩. মাটির পাত্র ব্যবহার করবে।
৪. মৃতদের কাফনসদৃশ পোশাক ব্যবহার করতে পারবে।
৫. শুধু লোহাই অলংকার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।
৬. ব্রাহ্মণের শূদ্র স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান উত্তরাধিকার লাভ করবে না।
৭. যে শূদ্র ব্রাহ্মণের কাছ থেকে মুক্তি চাইবে, সে বিচারের মুখোমুখি হবে।
৮. শুধু গাধা ও কুকুর পালন করতে পারবে।
৯. ব্রাহ্মণদের সেবার মধ্যেই শূদ্রের পরকালীন মুক্তি নিহিত। ব্রাহ্মণের সেবার সৌভাগ্য না হলে কোনো ক্ষত্রিয় বা বৈশ্যের সেবায় জীবন কাটিয়ে দেবে।
১০. ব্রাহ্মণদের মনঃকষ্টের কারণ হওয়ায় শূদ্ররা নিজেদের প্রয়োজনের অধিক সম্পদ সঞ্চয় করতে পারবে না।
শূদ্র সম্পর্কিত কিছু মনুর আইনও উল্লেখ করা হলো:
১. মহান প্রভু শূদ্রদের জন্য কেবলমাত্র একটি পেশা নির্ধারণ করেছেন, আর তা হলো অন্য তিন বর্ণের মানুষদের বিনীতভাবে সেবা করা।
২. একজন নিম্নবর্ণের লোক যে অঙ্গ দিয়েই কোনো উচ্চবর্ণের (বাকি তিন বর্ণের) লোককে আঘাত করুক না কেন, তার সেই অঙ্গ কেটে ফেলতে হবে।
৩. যে তার হাত বা লাঠি তুলবে তার হাত কেটে ফেলতে হবে। যে ক্রোধান্বিত হয়ে লাথি মারবে, তার পা কেটে দেওয়া হবে।
৪. অহংকারবশত সে যদি থুতু দেয় (উচ্চবর্ণের দিকে) তবে রাজা তার উভয় ঠোঁট কেটে ফেলার নির্দেশ দিবে। যদি সে প্রস্রাব করে (উচ্চবর্ণের ওপরে) তাহলে তার লিঙ্গ কেটে ফেলতে হবে। যদি সে বাতকর্ম (বায়ু ত্যাগ করা) করে উচ্চবর্ণের দিকে তাহলে তার মলদ্বার কেটে দেওয়া হবে।
৫. যদি সে উচ্চবর্ণের চুল ধরে টান দেয়, তাহলে রাজা কোনো ইতস্তত ছাড়াই তার হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দেবে। একই কথা পা, দাড়ি, ঘাড় অথবা অণ্ডকোষ (ধরে টান দেওয়া)-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
৬. একবার জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তি (মূলত শূদ্র। যাদের ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক শিক্ষাগ্রহণের অধিকার নেই।) যদি কোনো দুইবার জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিকে (বাকি তিনটি বর্ণ। যারা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করেছে ধরা হয়।) অপমান করে, তাহলে তার জিভ কেটে ফেলতে হবে; কারণ সে এসেছে নিম্ন বর্ণ থেকে।
৭. যদি সে তাদের (দুইবার জন্মগ্রহণকারীদের) নাম ও কুল অশ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করে একটি দশ আঙুল সমান লম্বা লোহার পেরেক আগুনে গরম করে তার মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে।
৮. সে যদি অহংকারবশত ব্রাহ্মণদেরকে তাদের কর্তব্য শিক্ষা দেয় তবে রাজা উত্তপ্ত তেল তার মুখ ও কানে ঢেলে দেওয়ার নির্দেশ দিবে।
৯. একজন নিম্নবর্ণের মানুষ নিজে একজন উচ্চবর্ণের মানুষের সাথে একই আসনে বসার চেষ্টা করলে তার নিতম্বে ছ্যাঁকা দেওয়া হবে এবং তাকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হবে অথবা রাজা তার নিতম্ব জ্বালিয়ে দিবে।
১০. যে লোক ব্রাহ্মণ নয় তাকে ব্যভিচারের জন্য মৃত্যুবরণ করতে হবে। অর্থাৎ ব্রাহ্মণরা ব্যাভিচার করলেও মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হবে না।
১১. একজন শূদ্র যদি যদি দুইবার জন্মগ্রহণকারী কোনো (বিবাহিত বা অবিবাহিত) মেয়ের সাথে সহবাস করে, তাহলে সে এসব শাস্তির সম্মুখীন হবে: নারীটি অবিবাহিত থাকলে নিজের বিশেষ অঙ্গ ও সম্পত্তি হারাবে। আর যদি সে নারী বিবাহিত অবস্থায় থাকে তাহলে শূদ্র তার সব হারাবে (এমনকি জীবনও)।
ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ৯০ সূক্তটি "পুরুষ সূক্ত" নামে বিখ্যাত। এখানেই বলা হয়েছে "পদভ্যাং-শূদ্র অজায়ত" অর্থাৎ পা হইতে শূদ্র সৃষ্টি হয়েছে। স্বনামখ্যাত অনুবাদক ও টীকাকার রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয় এ সূক্ত সম্বন্ধে বলেন, "ঋগ্বেদে অন্য কোনো অংশে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এ চারি জাতির উল্লেখ নেই। জাতি বিভাগ প্রথা ঋগ্বেদের সময় প্রচলিত ছিল না। ঋগ্বেদে এ কু-প্রথার একটি প্রমাণ সৃষ্টি করার জন্য এ অংশ প্রক্ষিপ্ত হয়েছে।"
ঋগ্বেদের বাণীর বিরুদ্ধে মত থাকলেও এর প্রভাব ভারতীয় সমাজে ছিল লক্ষণীয় পর্যায়ে। হয়তো আর্যরা আক্রোশবশত উক্ত সূক্তটি ঋগ্বেদে সংযোজন করে। যেমন বাঙালিদের জন্য তারা তৈরি করেছিল স্বতন্ত্র নরক! প্রাচীন ভারতীয় সমাজে ঋগ্বেদের সূক্তটির সামাজিক বিভাজন নিয়ে রুশ ঐতিহাসিক A.Z.Manfred লিখেছেন, "The most privileged caste was that of the priests Brahmens who were freed from all types of texation, conscription and corporal punishment, According to the laws of ancient India a nine years old member of the Brahman cast was considered as father in relation to a ninety years old member of the Kshatriya. In peace time the Kshatriya cast led a relativity undisturbed existence and recived rich gifts and favours from the kings, but in time of war they were the only section of the population required to fight. The vaisya cast had to pay taxes into the state treasury: commune peasants up to one-sixth of there hervest and merchants up to fifth of their income. Most wretched of all was the position of the Sudra caste/ Member of this caste had no right whatever but merely obligations. Member of higher castes only had to pay a fine for the murder of a Sudra, the same as for killing a dog."
অর্থাৎ কোন ব্রাহ্মণ যদি শূদ্রকে হত্যা করে তাহলে শুধুমাত্র সামান্য জরিমানা দিলেই চলত। যেমন: একটা কুকুর মেরে ফেলার শাস্তিস্বরূপ কিছু জরিমানা দিতে হয়!
ব্রাহ্মণ জাতি শূদ্রকে বিয়ে করতে পারতো না, ধর্মে নিষেধ, কিন্তু অবৈধ সহবাস বা ব্যভিচার তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল না। 'শূদ্রকে বিবাহ করা অসঙ্গত, কিন্তু তাহার সহিত অবৈধ সহবাস তদৃশ নিন্দনীয় নয়'। সে যুগের অবস্থার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ধর্মের নামে, দেবদেবীর নামে দেবালয়াভ্যন্তরে যে ধরনের চিত্র প্রদর্শিত হতো এরও কিছুটা নমুনা বিখ্যাত বাঙালি ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার 'বাংলাদেশের ইতিহাস' বইতে উল্লেখ করেছেন, "রাজ প্রাসাদে প্রতি সন্ধ্যায় 'বেশ বিলাসিনীজনের মঞ্জুরনে" আকাশ প্রতিধ্বনিত হয়; সে যুগের কবি মন্দিরের একশত দেবদাসীর রূপ যৌবন বর্ণনায় উচ্ছ্বসিত হইয়া লিখিয়াছেন যে, ইহারা কামিজনের কারাগার সংগীত কেলীশ্ৰীব সঙ্গম-গৃহ এবং ইহাদের দৃষ্টিমাত্র ভস্মীভূত কাম পুনরুজ্জীবিত হয়। সে যুগে, কবি বিষ্ণু মন্দিরে লীলাকমল হস্তে দেবদাসীগণ লক্ষ্মীর সহিত তুলনা করতে দ্বিধা করেন নি, সে যুগের নরনারীর যৌন জীবন সম্বন্ধে ধারণা ও আদর্শ বর্তমানকালের মাপ-কাঠিতে বিচার করলে খুব উচ্চ ও মহৎ ছিল, এরূপ বিশ্বাস করা বড়ই কঠিন।"
বিখ্যাত পর্যটক আল-বিরুনী লিখেছেন, কোনো বৈশ্য এবং শূদ্র বেদ অধ্যয়ন করলে শাস্তি হিসেবে তার জিহবা কেটে নেয়া হতো। উচ্চ জাতির লোক অপেক্ষা নিম্নজাতির লোকদেরকে কঠোর শাস্তি দেয়া হতো। হিন্দু সমাজে শূদ্রগণ ছিল ভারবাহী পশুর ন্যায়; বিভিন্ন জাতির মধ্যে আন্তর্বিবাহ কিংবা পংক্তি ভোজন নিষিদ্ধ ছিল; এমনকি শূদ্রগণের স্পর্শও অপবিত্র বলে গণ্য হতো। এভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী দুর্ভাগ্য শূদ্র নরনারী নিম্নস্তরের জীবন-যাপন প্রণালির অলঙ্ঘনীয় শর্ত হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছিল।
দক্ষিণ ভারতের মহাকাব্যে-
দক্ষিণ ভারত। তিন দিকে জল দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় একে পেনিনসুলার ইন্ডিয়া বা উপদ্বীপীয় ভারত নামেও অভিহিত করা হয়। এ. পি. জে. আবদুল কালাম কিংবা পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রথম এশীয় বিজ্ঞানী সি. ভি. রমনের জন্ম এই দক্ষিণ ভারতেই। এই অঞ্চলটি প্রাচ্যের সাথে পাশ্চাত্যকে (অর্থাৎ এশিয়াকে ইউরোপ বা পশ্চিমা বিশ্বের সাথে) সংযোগকারী প্রাচীন সিল্ক রোডের অংশ ছিল। দক্ষিণ ভারতে সবচেয়ে বেশি যেসব ভাষায় কথা বলা হয় সেগুলো হলো: তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালায়লাম।
দক্ষিণ ভারতের আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো একটি স্বাধীন সাহিত্য ঐতিহ্য আছে। দক্ষিণ ভারতের প্রাচীনতম পরিচিত সাহিত্য হলো কাব্যিক Sangam Literature, যা তামিল ভাষায় রচিত। আদি তামিল সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে প্রাচীনতম ব্যাকরণ গ্রন্থ 'থোলকাপ্পিয়াম' (Tholkappiyam) এবং মহাকাব্য 'সিলাপ্পাতিকারাম' (Silappatikaram) ও 'মাণিমেকালাই' (Manimekalai)। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দী থেকে কন্নড় সাহিত্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। তেলেগু সাহিত্য প্রাকৃত ভাষার একটি রূপ গ্রহণ করেছিল, যা কালক্রমে তেলেগু ভাষার পূর্বসূরি হয়ে ওঠে। স্বতন্ত্র মালায়লাম সাহিত্য আত্মপ্রকাশ করে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে।
উনবিংশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতেই আয়্যাভাজি (Ayyavazhi) নামের নতুন ধর্মের উৎপত্তি হয়। যদিও এটিকে অনেকেই হিন্দু ধর্মেরই একটি ধারা বা উপশাখা মনে করে। এই দক্ষিণ থেকেই হিন্দু ধর্মের আরো দুটি ধারা, বৈষ্ণব এবং শৈব, উত্তরে প্রবাহিত হয়। অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত ধর্মীয় সংস্কারের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় দক্ষিণ। শংকর, রামানুজ, নিম্বাদিত্য, বাসব, বল্লভাচার্য ও মাধব প্রচার করতে শুরু করেন তাদের দার্শনিক মতবাদ।
সেই সময় উত্তর ভারতে হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছে। বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষয় শুরু হয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে তা শৈব ও শাক্ত মতবাদের সাথে মিশে যেতে থাকে। জায়গা দখল করে পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম। উত্তর ভারতে মুসলিমদের হাতে যখন সামরিক ও আধ্যাত্মিকভাবে হিন্দু সমাজ একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়ে তখন দক্ষিণ ভারতে হিন্দু ধর্মের জয়জয়কার অবস্থা। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের বিরুদ্ধে হিন্দু ধর্মের জয়লাভ এক নতুন প্রেরণার সঞ্চার করে। তবে তারাও মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে মুসলিম চিন্তাভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হয়। এ সময়কালে শুধুমাত্র সামরিক লড়াই নয়, লড়াই চলছিল দক্ষিণ ভারতের মানুষের ধর্মীয় সামাজিক জীবনেও।
অনেক আগেই তামিল ভূখণ্ডের পাহাড় ও বন-জঙ্গলের দেবতারা আর্য দেব-দেবীদের সঙ্গে মিশে যায়। খ্রিস্টীয় প্রথম কয়েক শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতে বিভিন্ন ধর্মের সংমিশ্রণ ঘটে। সর্বপ্রাণবাদ, অপদেবতার পূজা, শৈব, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, জৈনসহ অন্যান্য ধর্মমত প্রতিবেশীর মত শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে। দক্ষিণ ভারতের গত প্রায় দুই হাজার বছরের ধর্মীয় ইতিহাস ঘাটলে কখনো স্থিতিশীল মনে হয় না। নতুন নতুন দার্শনিক মতবাদ কিংবা ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে। তবে এর কারণ মনে হয় আর্যদের দ্বারা তাদের হারানো সম্মান ও শৌর্যের সাথে মাথা উঁচু করে জীবন-যাপন করার আকাঙ্ক্ষা। উল্লেখ্য, দক্ষিণ ভারতে হিন্দুদের একটা বিশাল অংশ নিম্ন বর্ণের হিন্দু বা শূদ্র।
সর্বপ্রথম মনে হয় শংকর শূদ্রদের জন্য কিছু করার পথ খুলে দেন। শংকরের জন্ম হয় অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে শিবগুরু নামের একজন নাম্বুতিরি ব্রাহ্মণ ও আর্যম্বা নামের ব্রাহ্মণ নারীর ঘরে। মালাবার উপকুলের এলুবয় নদীর উত্তর তীরে কলদি গ্রামে। তার গুরু গোবিন্দ যোগী তাকে পরমহংস উপাধি দেন। সদিচ্ছা সত্ত্বেও তার ন্যায়শাস্ত্রসম্মত অদ্বৈতবাদী মতবাদ (ঈশ্বর এবং জগতের সবকিছু এক ও অভিন্ন সত্তা, আলাদা নয়) উল্টো সাধারন মানুষকে পুরোহিত সম্প্রদায়ের করুনা ও তাদের বহু বিস্তৃত আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে নিক্ষেপ করে। তিনি হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করতে চেষ্টা করেন কিন্তু সফল হননি। তবে তার পরবর্তী চিন্তাবিদরা কোনো না কোনোভাবে তার চিন্তা পদ্ধতি ও উপস্থাপন পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।
তন্মধ্যে রামানুজ অন্যতম। রামানুজের লক্ষ্য ছিল শঙ্করের চরম অদ্বৈতবাদ ও মায়াবাদ (জগতের সবকিছু মায়া বা কল্পনা বা স্বপ্ন; শুধু ঈশ্বর সত্য) খন্ডন ও বেদান্ত দর্শনের ভিত্তিতে ভক্তিবাদ (মানুষের মুক্তি লাভের একমাত্র উপায় ঈশ্বরকে গভীর ভালোবাসা ও তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তি) প্রতিষ্ঠা। সে উচ্চবর্ণের লোকের প্রাচীনকালের সব সুবিধাভোগ সমর্থন করলেও শূদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য একটি পথও খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। অচ্ছুৎরা বছরের একটা নির্দিষ্ট দিন কয়েকটি নির্দিষ্ট মন্দিরে যেতে পারবে। শতনী নামে একটি শূদ্র গোষ্ঠীকে তিনি শিক্ষা দেন এবং নিজ সম্প্রদায়ভুক্ত করেন। প্রপত্তির জন্য তার শিক্ষা দু'টি মতবাদী গোষ্ঠীর সূচনা করা। দক্ষিনে তৈরি হয় 'তেঙ্গালাই'। যারা মনে করত ঈশ্বরের অনুগ্রহ বাধ্যতামূলক। উত্তরে তৈরি হয় 'বদগলই'। যারা মনে করত ঈশ্বরের করুণা সহযোগিতামূলক। প্রপত্তিকে দক্ষিণাঞ্চলীয়রা মনে করতো একমাত্র উপায় আর উত্তরাঞ্চলীয়রা মনে করত অন্যতম উপায়। নিম্ন বর্ণের মানুষের সঙ্গে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ও অন্যান্য বিষয়েও এই দুই পক্ষের মধ্যে ভেদাভেদ দেখা যায়।
বৈষ্ণব আচার্যদের প্রথম ব্যক্তি নাথমুনি ছিলেন রামানুজের শিক্ষক। শৈব আচার্যদের মধ্যে সর্বপ্রাচীন ছিলেন নাম্বিয়ান্দার নাম্বী তার সমসাময়িক। আশ্চর্যজনক হলো প্রথম শৈব শাস্ত্রবিদ ছিলেন মেয়কান্দার দেব। তিনি ছিলেন একজন শূদ্র! তিনি সংস্কৃত ভাষায় রচিত রৌরব আগম সূত্র তামিল ভাষায় অনুবাদ করেন এবং নাম দেন শিব জ্ঞানবোধ। তার শিষ্য অরুলনান্দি দেব গ্রন্থটির উপর ভাষ্য এবং অন্যান্য মতবাদের বিতর্কমূলক সমালোচনা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। অরুলনান্দির একজন শূদ্র শিষ্য শৈব সিদ্ধান্ত নামে অন্য একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই শূদ্র আচার্যের ব্রাহ্মণ শিষ্য উমাপতি শৈব সম্প্রদায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্রবিদরূপে খ্যাতি লাভ করেন।
দক্ষিণ ভারতের এ ধর্মীয় সংস্কারবাদী বিপ্লবের প্রভাব হিসেবে কোন কোন ইতিহাসবিদ সেমিটিক ধর্মকে উল্লেখ করেছেন, আবার ফয়েট, বার্থের মত ইতিহাসবিদরা বলেছেন মুসলমানদের চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব। ডক্টর তারা চাঁদ এ সম্পর্কে বলেছেন, "ইসলামের প্রভাব প্রথমদিকে ছিল পরোক্ষ ক্ষেত্র বিশেষে সীমাবদ্ধ। যতদূর ধারণা করা যায়, এই প্রভাব মুসলিম সাহিত্য অধ্যায়নের ফল ছিল না, বরং তা ছিল মুসলিম ধর্মীয় সাধকদের মৌখিক শিক্ষা ও মুসলমানদের ধর্মানুষ্ঠান ও আচার-আচরণ প্রত্যক্ষ করার ফল।........"
দক্ষিণ ভারতের অন্য সব সম্প্রদায়ের তুলনায় দুটি সম্প্রদায়ের উপর ইসলামের প্রভাব পড়েছিল সবচেয়ে বেশি। তারা হলো লিঙ্গায়েত বা জঙ্গম এবং সিদ্ধার। লিঙ্গায়েতদের কিছু বিশ্বাস হলো:
• ঈশ্বর এক (পরা শিব)।
• ঈশ্বর সর্বজগদ্ব্যাপী।
• ধর্মে কোন বলিদান নেই।
• শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান নেই।
• বর্ণবাদে বিশ্বাস করা হয় না। সব মানুষ সমান।
• মৃতদেহ দাহ করা হয় না, কবর দেওয়া হয়।
সিদ্ধাররা ছিল দার্শনিক কবি সম্প্রদায়। তাদের মতবাদের চিহ্ন বর্তমানে নেই। ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে। তারাও একেশ্বরবাদী ছিলেন এবং শিবের নামে ঈশ্বরকে ডাকতেন। তাদের একটি কবিতার অনুবাদ উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করছি।
ঈশ্বর এক, বেদ, এক;
নিরাসক্ত সৎগুরু এক, এবং তাঁর
প্রবর্তিত নিয়ম এক,
এটা যে গ্রহণ করে তার স্বর্গ এক,
মর্ত্যবাসী মানুষের জন্মও এক;
এবং একটাই পথ আছে সবার চলার।
কিন্তু যারা বিশ্বাস করে চার বেদ ও ছয় শাস্ত্র
এবং বিভিন্ন মানুষের জন্য বিভিন্ন আচারে
এবং ঈশ্বরের বহুত্ত্বে
তারা নিক্ষিপ্ত হবে নরকের আগুনে।
প্রকৃত আরাধনা, আগুনে পোড়ানো
কাদা মাটির তৈরি প্রতিমা পূজার মধ্যে নেই।
পাথরে বা কাঠের তৈরি প্রতিমা পূজায় নেই।
মাটি দিয়ে হাতে তৈরি কাউকে মনে হতে পারে না ঐশী,
যে জানে, সে ঈশ্বর থেকে উদ্ভূত।
উপরিউক্ত দুটি উদ্ধৃতি থেকেই বোঝা যায় তারা ছিলেন প্রচণ্ড রকমের একেশ্বরবাদী। তারা বেদ বা শাস্ত্র পড়তেন না। মূর্তিপূজা করতেন না। জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করতেন না। ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের ধারণা এবং ঈশ্বরের মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়ার তত্ত্ব সুফীদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বস্তুত তাদের মধ্যে সুফীবাদের প্রভাব ছিল লক্ষণীয় পর্যায়ের।
জীবন কেটেছে যার বিদ্রোহে বিদ্রোহে-
ভীমরাও রামজি আম্বেডকর। ১৮৯১ সালের ১৪ই এপ্রিল মধ্যপ্রদেশের মহো (বর্তমানে ড. আম্বেডকর নগর) শহরে সেনানিবাসে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি ছিলেন সুবেদার পদমর্যাদার সেনা কর্মকর্তা রামজি মালজি সাকপাল এবং লক্ষ্মণ মুর্বদকরের কন্যা ভীমাবাই সাকপালের ১৪তম এবং শেষ সন্তান। তাঁর পরিবার আধুনিক মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি জেলার আম্বাদাওয়ে (মান্দানগড় তালুকা) শহরের মারাঠি বংশোদ্ভূত ছিল । তিনি ছিলেন মহর পরিবারের বা অস্পৃশ্য জাতির সন্তান। পরবর্তীতে তাকে অনেকে বাবাসাহেব বলে ডাকতেন।
ব্রিটিশদের নীতির কারণে অস্পৃশ্য হলেও তারা স্কুলে যেতে পারতো। তবে তারা স্পর্শ করে পানি খেতে পারত না। তাদের পানি খাওয়াতো স্কুলের পিয়ন। তিনি পরে তার লেখায় এই পরিস্থিতিকে "No peon, No Water" বলে বর্ণনা করেছেন। আম্বেডকরদের চটের বস্তার ওপর বসতে হতো এবং ক্লাস শেষে সেটাকে বাড়ি নিয়ে যেতে হতো। ১৮৯৭ সাল। আম্বেডকরের পরিবার মুম্বাই চলে আসে। যেখানে আম্বেডকর এলফিনস্টোন হাই স্কুলে ভর্তি হওয়া একমাত্র অস্পৃশ্য ছাত্র হন ।
তিনি ১৯১৫ সালের জুন মাসে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রধান বিষয় এবং সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন ও নৃবিজ্ঞানের মতো অন্যান্য বিষয়ে এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি Ancient Indian Commerce শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন । ১৯১৬ সালে, তিনি দ্বিতীয় এমএ ডিগ্রির জন্য তার দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর থিসিস, National Dividend of India – A Historic and Analytical Study সম্পন্ন করেন। ৯ মে, তিনি নৃতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার গোল্ডেনওয়াইজারের পরিচালিত একটি সেমিনারে Castes in India: Their Mechanism, Genesis and Development শীর্ষক গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন । আম্বেডকর ১৯২৭ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অর্থনীতিতে তার পিএইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেন।
তিনি ব্যবসা, অধ্যাপনা, সম্পাদক থেকে আইনজীবী হয়ে পূর্ণ বিপ্লবীতে পরিণত হোন। জীবন উৎসর্গ করেন দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়। তিনি একইসাথে ভারতের সংবিধান রচনার সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে দলিত সম্প্রদায় তার সম্মানে 'জয় ভীম' স্লোগানও দিয়েছিল। তার উল্লেখযোগ্য কাজ হলো:
• দলিত অধিকার রক্ষার জন্য তিনি অনেকগুলো সাময়িকী প্রকাশ শুরু করেছিলেন।
• ১৯২৭ সাল নাগাদ তিনি জনসাধারণের জন্য পানীয় জলের উৎস উন্মুক্ত করার দাবিতে গণ আন্দোলন এবং মিছিলের মাধ্যমে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন শুরু করেন।
• ১৯২৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর, তিনি হাজার হাজার অনুসারীকে নিয়ে মনুস্মৃতির অনুলিপি পোড়ান। এই দিনটিকে প্রতিবছর তার অনুসারীরা মনুস্মৃতি দহন দিবস নামে পালন করে।
• তিনি হিন্দু মন্দিরে প্রবেশের অধিকারের জন্যও সংগ্রাম শুরু করেন।
• ১৯৩০ সালে, আম্বেডকর তিন মাসের প্রস্তুতির পর কালারাম মন্দির আন্দোলন শুরু করেন। প্রায় ১৫,০০০ স্বেচ্ছাসেবক কালারাম মন্দিরের সত্যগ্রহে সমবেত হয়ে নাসিকের অন্যতম বৃহত্তম শোভাযাত্রা তৈরি করে। যদিও শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণরা মন্দিরের ফটক বন্ধ করায় তিনি দেবতা দর্শনে সফল হোননি।
• ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর, পুনা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যেখানে আম্বেডকর (হিন্দুদের মধ্যে অস্পৃশ্য শ্রেণীর পক্ষে) এবং মদন মোহন মালবীয় (অন্যান্য হিন্দুদের পক্ষে) সহ ২৩ জন স্বাক্ষরকারী ছিলেন । এই চুক্তিটি অস্থায়ী আইনসভায় সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলীর মধ্যে অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য সংরক্ষিত আসন প্রদান করে। পুনা চুক্তির মাধ্যমে নীতিগতভাবে একটি একীভূত নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয়েছিল। মূলত এতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নির্বাচনে অস্পৃশ্যদের নিজেদের প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
• ১৯৩৬ সালের ১৫ মে তিনি তাঁর বই 'অ্যানিহিলেশন অফ কাস্ট' প্রকাশ করেন। এতে হিন্দু রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতাদের (মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরুসহ) এবং সাধারণভাবে বর্ণপ্রথার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
• ১৯৩৭ সালে, আম্বেডকর সরকার এবং কৃষকদের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে খোটি প্রথা বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে বোম্বে বিধানসভায় একটি বিল পেশ করেন।
আম্বেডকর ১৯৩৫ সালে বলেছিলেন যে তিনি হিন্দু হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন কিন্তু হিন্দু হিসেবে মৃত্যুবরণ করবেন না। তিনি হিন্দুধর্মকে একটি নিপীড়নমূলক ধর্ম হিসেবে দেখতেন এবং অন্য কোনো ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন। আম্বেডকর খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মকেও সমালোচনা করে বাদ দেন। প্রথমে শিখ ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পাঁচ লক্ষ অনুসারী নিয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তার এই গণধর্মান্তর প্রক্রিয়া পরবর্তীতে দলিত হিন্দুদের মধ্যে সুনামীর মতো প্রভাব বিস্তার করে। মিনাক্ষীপুরামের ঘটনাও তার প্রতিক্রিয়া বা মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাবিত হয়েছে বলে মনে হয়।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রামাস্বামী নাইকার (Ramaswami Naicker) অস্পৃশ্যদের অবস্থার ব্যাপক উন্নয়নের প্রকল্প হাতে নেন। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে Dravidar Kazhagam নামের একটি সংগঠনের গোড়াপত্তন করেন। এতে দলিতরা খ্রিস্ট, বৌদ্ধ ও ইসলাম সম্পর্কে অধ্যয়নের সুযোগ পায়। পরবর্তীতে খ্রিস্টান ও বৌদ্ধধর্মের বিপরীতে তাদের অনেকেই ইসলামের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠে।
মিনাক্ষীপুরামের রহমতনগর সফর-
সাল ১৯৮০। মিনাক্ষীপুরাম গ্রামে ৩০০টি পরিবার বাস করতো। তন্মধ্যে ২৮০টি পরিবার ছিল 'পল্লার' জাতের হরিজন এবং বাকিগুলো প্রভাবশালী 'মারাবার' জাতের। মারাবার এবং পল্লার দু'জাতই শূদ্র হলেও মারাবাররা ছিল উঁচু স্তরের! মীনাক্ষীপুরামের আশেপাশের জমিগুলোর মালিক ছিল একটি হিন্দু মঠ। সেগুলো মীনাক্ষীপুরাম ও আশেপাশের গ্রামের মারাবার ও হরিজন বর্গা চাষিরা চাষাবাদ করতো। ১৯৬৯ সালে মারাবারদের নিয়ন্ত্রণে বর্গা চাষিরা একটি সমবায় সমিতি গঠন করে। কিন্তু ১৯৮০ সালে হরিজনরা নিজস্ব সমিতি গঠন করলে সমবায়টি বিভক্ত হয়ে যায়। মারাবাররা এটাকে তাদের ঐতিহ্যগত আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে এবং দুই জাতের মধ্যকার সম্পর্কের তীব্র অবনতি ঘটে।
অবশ্য সম্পর্কের অবনতি আরো আগেই শুরু হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে যখন এক হরিজন যুবক এক মারাবার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যায়। তারা কেরালায় গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। গ্রামে ফিরে এসে সেই যুবক একটি এস্টেটে কাজ শুরু করে। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে এস্টেটের দুজন মারাবার গার্ডকে হত্যার ঘটনায় তার জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হয়। পুলিশি তদন্তের নামে বিপুলসংখ্যক হরিজনকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হলেও শেষ পর্যন্ত অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়। তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক নিজেও ছিলেন একজন মারাবার। যার স্ত্রীর নামে মীনাক্ষীপুরামে জমি ছিল। হরিজনরা অভিযোগ তোলে সে হরিজনদের বিরুদ্ধে স্থানীয় মারাবারদের সাথে যোগসাজশ করেছে।
পুলিশের এই কঠোর নির্যাতনের মুখে পড়ে ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে মীনাক্ষীপুরামের একদল হরিজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আগেও এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু প্রবীণ ও রক্ষণশীল হরিজনরা এর বিরোধিতা করায় ফিরে আসে। ততদিনে প্রবীণ হরিজন নেতাদের স্থান বদলে গিয়েছে। জাত বৈষম্যের প্রতি ক্ষুব্ধ একদল তরুণ ও শিক্ষিত প্রজন্ম সেই স্থান দখল করেছে। ১৯৮১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তিরুনেলভেলি জেলা সদরে অবস্থিত নওমুসলিমদের সহায়তাকারী মুসলিম সংগঠন Isha-A'at-ul Islam Sabha-এর পরিচালনায় তারা ইসলাম গ্রহণ করে। প্রাথমিকভাবে ২৮০টি হরিজন পরিবারের মধ্যে ২২০টি পরিবার ইসলাম গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু আবেদন করে ২০০টি পরিবার এবং শেষ পর্যন্ত ১৮০টি পরিবার একসাথে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ১৯৮১ সালের ২৩ মে দ্বিতীয় দফায় আরও ২৭টি পরিবার ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলাম গ্রহণ করার পর গ্রামবাসীরা তাদের গ্রামের নাম 'মীনাক্ষীপুরাম' থেকে পরিবর্তন করে 'রহমতনগর' রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
মীনাক্ষীপুরামের এই ঘটনাটি বোঝার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক. মারাবার, কলার, ভান্নিয়ার জাতির সাথে নিম্ন সামাজিক মর্যাদার নাডার ও হরিজনদের দীর্ঘদিনের সংঘাতের ইতিহাস। দুই. নাডার ও হরিজনদের ক্রমোর্ধমুখী আর্থ-সামাজিক অবস্থান।
উত্তর তিরুনেলভেলি জেলার অনেক গ্রামে, রামনাদের অধিকাংশ এলাকা এবং মাদুরাই জেলার কিছু অংশে মারাবররা অত্যন্ত প্রভাবশালী জাতি। তারা প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ পাহারা ব্যবস্থার (কাভাল) মূল ভিত্তি ছিল। ১৮ শতকের দিকে তারা মুসলিম ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পলিগারদের জনশক্তির যোগান দিত। কিন্তু ১৮০১ সালে ব্রিটিশদের হাতে পলিগারদের পরাজয় এবং কাভাল ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার পর তারা পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেয় এবং বহু এলাকায় প্রভাবশালী কৃষিভিত্তিক জাতি হিসেবে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখে।
অপরদিকে তামিলনাড়ুর দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে হরিজনরা ঔপনিবেশিক আমলে খ্রিস্টান মিশনারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা শিক্ষার সুযোগ পায় এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাক্ষরতার হার ও আর্থসামাজিক অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সমগ্র তামিলনাড়ুতে মাদ্রাজ শহরের পর তিরুনেলভেলি জেলায় হরিজনদের মধ্যে সাক্ষরতার হার সবচেয়ে বেশি। উন্নত শিক্ষা এবং ঊর্ধ্বমুখী সামাজিক গতিশীলতা তাদের মধ্যে ক্রমাগত বর্ণ বৈষম্যের শিকার হওয়া নিয়ে অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।
১৯৫৭/৫৮ সালে দক্ষিণ তামিলনাড়ু এবং বিশেষ করে পূর্ব রামনাদ জেলায় মারাবার ও হরিজনদের মধ্যে মারাত্মক সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি হয়। এই সংঘাত পরবর্তীতে পৌনঃপুনিকভাবে চলতে থাকে। এ সংঘাতের পরপরই বিপুল সংখ্যক হরিজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং ধর্মান্তরিত হওয়ার ঢেউ শুরু হয়। Isha-A'at-ul Islam Sabha ১৯৪৪ সালে দক্ষিণ তামিলনাড়ুতে এক পূর্ববর্তী গণ-ধর্মান্তরের পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়া হরিজনরা বিদেশ থেকে যুদ্ধ শেষে এসে বর্ণ হিন্দুদের হাতে বৈষম্যের শিকার হওয়ার তীব্র প্রতিবাদ করে এবং ধর্মান্তরিত হয়। প্রথম ধর্মান্তর ঘটেছিল মাদুরাই জেলার সিলায়ামপট্টিতে এবং পরবর্তীতে একই বছরে তিরুনেলভেলি জেলায় ২৩৫টি হরিজন পরিবার ধর্মান্তরিত হয়। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে মাদুরাই জেলার বিভিন্ন অংশে প্রায় প্রতি বছরই ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর ঘটেছে।
Frank S. Fanselow তার গবেষণায় বলেছেন, "Subsequent independent inquiries into the Minakshipuram conversions agreed that a combination of harassment by caste Hindus and police repression were responsible for the mass conversions."
অর্থাৎ, পরবর্তী সময়ের স্বাধীন অনুসন্ধানেও উঠে আসে, মিনাক্ষীপুরামের গণধর্মান্তরের জন্য মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দুদের হ্যারাসমেন্ট এবং পুলিশি নির্যাতন-নিপীড়ন যৌথভাবে দায়ী।
মীনাক্ষীপুরাম এবং তার আশেপাশে ধর্মান্তরের পরপরই সমাজবিজ্ঞানী মমতাজ আলী খান কর্তৃক পরিচালিত একটি মতামত জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ এই বক্তব্যের সাথে একমত হন যে - "বর্ণ হিন্দুদের অসহনীয় নির্যাতনের কারণেই হরিজনরা ধর্মান্তরিত হয়"।
উক্ত জরিপে ৩৫০ জন অংশগ্রহণ করেছিল। যার মধ্যে ১০০ জন ধর্মান্তরিত হরিজন এবং ৫০ জন অ-ধর্মান্তরিত হরিজন ছিল। তারা সবাই উক্ত বক্তব্যের সাথে একমত প্রকাশ করেন। তবে ৩৯ জন মারাবার উত্তরদাতার একজনও একমত হননি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অংশগ্রহণকারী ৬০ জন ব্রাহ্মণের মধ্যে ৫০ জনও এই বক্তব্যের সাথে একমত হন!
Frank S. Fanselow তার গবেষণায় সিদ্ধান্তে পৌঁছেন, "The Minakshipuram conversions were therefore neither new nor unique. They fall within an established historical pattern in this area. They are less of a protest against the existing social order, than an opportunistic
move by an underprivileged community seeking to improve its position within the existing order by allying itself with powerful groups formally
outside the caste structure. They are therefore not unlike the conversions to Islam and Christianity which occurred during the periods of Muslim and British rule. Rather than being the vanguard of a strategic Muslim resurgence aimed at subverting Hindu society, they were at the tailend of a long established pattern of tactical conversion."
অর্থাৎ, মিনাক্ষীপুরামের গণধর্মান্তর নতুন বা ব্যতিক্রমী কিছু ছিল না। এটি এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক ধারার পুনরাবৃত্তি ছিল শুধু। যেখানে তারা বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে বড় কোন প্রতিবাদ না করে চলমান ব্যবস্থাতেই নিজেদের অবস্থান উন্নত করতে চেয়েছিল (অন্য কোন ধর্ম বা গোষ্ঠীর সাথে একাত্ম হয়ে)। এটা কোন মুসলিমদের চক্রান্ত করা বা ইসলামের জাগরণ সৃষ্টি করে হিন্দু ধর্মের ধ্বংস করার লক্ষ্যে সংগঠিত হয়নি। বরং ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা নিম্নবর্ণের কৌশলগত স্ট্র্যাটেজি ছিল।
তার সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা আরো বেড়ে যায় যখন দেখা যায় পরবর্তীতে দলিত রাজনৈতিক নেতারা বর্ণবাদী রাজনৈতিক নেতাদের ধর্মান্তরের প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যায়। এর উপর ভিত্তি করে হিন্দু ধর্মের এক নবজাগরণ সৃষ্টি হয় দলিতদেরও অধিকার দেওয়ার জন্য (মূলত হিন্দু ধর্মে ধরে রাখার জন্য)। অনেক ব্রাহ্মণ সাধুরা ধর্মীয় নিয়মনীতি জলাঞ্জলি দিয়ে সম্প্রীতির আশ্বাস দেওয়ার জন্য দলিতদের সাথে বসে খাওয়া-দাওয়াও করে!
আরএসএস দাবি করে,
"Such conversions do not merely imply a simple change in the way of worship but destruction of national culture and sentiments, growth of separatist and secessionist tendencies and extra-territorial loyalties and communal animosities and flare-ups as well, which directly strike at the roots of our national integrity and security... such conversions should be a matter of serious concern to all patriotic and nationalist people... [and appealed to] our Hindu Harijan brethren to stand united, as in the past, with the main body of Hindu society, keeping in view the interests of our nation and refuse to play into the hands of such anti-national forces."
অর্থাৎ, এ ধরনের ধর্মান্তর কেবল উপাসনা বদল নয়; বরং এটি জাতীয় সংস্কৃতির বিনাশ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্ম দেয়, যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে। তাই দেশপ্রেমিক মাত্রেরই এ বিষয়ে গভীর উৎকণ্ঠা থাকা উচিত। আমাদের হরিজন ভাইদের প্রতি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে আপনারা অতীতের মতো হিন্দু সমাজের মূল ধারার সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং এহেন রাষ্ট্রবিরোধী শক্তির পাতা ফাঁদে পা দেবেন না।
এছাড়া বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনগুলোও দাবি করে হরিজনরা ধর্মান্তরিত হয়েছে মুসলিমদের জোর জবরদস্তি কিংবা ব্রেইন ওয়াশের কারণে। উক্ত দাবির অসারতা তামিলনাড়ুর Daily Dina Malar পত্রিকায় ২৯ জুন ১৯৮১ 'মীনাক্ষীপুরামের কাছ থেকে আমাদের প্রাপ্ত শিক্ষা' শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে। যেখানে লেখা হয়েছিল,
"মীনাক্ষীপুরামের জনসংখ্যা ৯৪৫ জন। তন্মধ্যে ৫৫৮ জন ইসলাম গ্রহণ করে। তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতির মান অন্যদের চেয়ে উন্নত। তাদের মধ্যে দুজন ডাক্তার, একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং বেশ কয়েকজন প্রফেসর রয়েছেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ তারা তাদের গ্রামের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম হিসেবে 'রহমতনগর' স্থির করে। তাদের বলা হয়েছিল, 'ভারত সরকার তোমাদের সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে দেবে।' তখন তারা সমস্বরে বলেছিল, 'আমরা সম্মানের জীবনযাপনের জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমরা সব ধরনের সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে প্রস্তুত!'"
হিন্দুরা ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮১ দিল্লিতে একটি হিন্দু মহাসম্মেলন আহ্বান করে। এতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লক্ষাধিক হিন্দু অংশগ্রহণ করে। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরণ সিং। তিনি তার সূচনা-বক্তব্যে বলেন, 'হিন্দুদের এভাবে ধর্মান্তরিত হওয়া, বিশেষত ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার ফলে শীঘ্রই বিভিন্ন সমস্যার জন্ম দেবে।' তিনি তার ভাষণে এ কথা মানতে বাধ্য হন যে, হিন্দুরা দলিতদের মানবাধিকার প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে হিন্দুদের ঐক্য ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের আহ্বান জানান। নিজেদের মধ্যকার বিভেদ কমিয়ে আনতে ও হিন্দুসমাজের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার তাগিদ দেন।
তবে দলিত নেতা জগজ্জীবন রাম অভিযোগ করেন, "ভারত সরকার উগ্রপন্থি সংগঠন আরএসএসকে এই হিন্দু মহাসম্মেলন আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছিল।" তিনি আরও বলেন, "আমি মনে করি না, ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার ফলে তাদের অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে; কিন্তু এর মাধ্যমে তারা হিন্দুসমাজের নিপীড়ন ও অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবে।"
ড. জিয়াউর রাহমান আজমি তার বইতে বলেছেন, "আমি মনে করি, এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুত্ববাদ অব্যাহত রাখতে হিন্দুদের সচেতন করা। ভারত উপমহাদেশে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে ইসলামের দাওয়াতি প্রভাবের ব্যাপারে জাগরুক করে তোলা। এ ক্ষেত্রে সম্মেলনটি বেশ সফলতা অর্জন করেছিল। এই সম্মেলনের পর নওমুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন উগ্র ধর্মীয় সংগঠনের জন্ম হয়, যারা ইসলামবিরোধী প্রচারণামূলক কাজ অব্যাহত রাখে। এ লক্ষ্যে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের হিন্দু ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞের আয়োজন করা হয়। এতে প্রায় ৩ হাজার হিন্দু পণ্ডিত নাম লেখান। এ সংখ্যা দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।"
সম্মেলনটি আসলেই সফলতা পেয়েছিল কিনা মন্তব্যটির যথার্থতা আমরা খুঁজে পাই ঘটনাটির এক দশক পরেই। যখন প্রায় ৮৫% হরিজন পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে আসে। পুনর্ধর্মান্তরের ক্ষেত্রে শুদ্ধি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন, পৈতৈক সুতা ধারণ, গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ এবং সনাতন ধর্মের প্রতি অনুগত থাকার শপথ করানো হয়। এর আয়োজন করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস। যদিও আরএসএস দাবি করে পুনর্ধর্মান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারের নিকট থেকে তফসিলি জাতির (Scheduled Caste) সনদ উদ্ধার করা, কারণ ইসলামে ধর্মান্তরের ফলে তারা সরকারি সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হয়েছিলো।
স্বাধীনতা, তুমি আমাকে ভুলে যাও!
তুমি ও আমি এই লড়াইয়ের অস্থি এবং রক্ত
শরীরের মাংস গড়তে আমরা উচ্ছিষ্ট খেয়েছি
দিনের আলোর স্বাদ না জেনে
শাস্ত্রাচার পালন করেছি অন্ধকারে
ক্লেশের চাদরে মোড়া আমাদের সকাল
ওই চাদরগুলির আর কোনো অনুভূতি নেই......
এখন আর কোনো ভোরের বাজনা বাজে না
পৃথিবীতে আর নৃত্য করে না গায়ক-গায়িকার দল
যখন বোনেদের বিবাহ হয়ে যায়
সেসব হারিয়ে গেছে গৃহে অরণ্যে, লড়াই করছে
দক্ষিণ সাহারায়
আমরা তো সম্পূর্ণ ঘোষণা করেই শুরু করেছি যুদ্ধ
আর শেষ মানুষটির হাড় ভাঙার জন্য অপেক্ষা করছি
- হিউবার্ট টেম্বা
ভারতে বর্তমানে প্রায় ২৫ কোটির উপরে হরিজন আছে। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা হরিজনদের পশুর থেকেও অধম মনে করতো। দোকানে-রেস্টুরেন্টে, জলাশয়ে বা নদীর ঘাটে তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না। ১৯৫০ সালে সাংবিধানিক বিধি জারি করা হয় কেউ অচ্ছুৎ নয়, কাউকে অচ্ছুৎ বলে বিবেচনা করা যাবে না। ১৯৫৫ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে হরিজনদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে আইন পাস করা হয়। কিন্তু এর পরেও হরিজনদের প্রতি অবিচার ও নির্যাতন থেমে থাকেনি। এ পর্যন্ত প্রায় লাখ লাখ হরিজনদের উচ্চবর্ণের হিন্দুরা অস্ত্রের আঘাতে কিংবা পুড়িয়ে হত্যা করেছে। পর্তুগিজরা ভারতীয় হিন্দু সমাজব্যবস্থায় সামাজিক অসমতা ভিত্তিক প্রথাকে বোঝানোর জন্য Caste শব্দটি প্রয়োগ করে। যার সংস্কৃত ভাষায় অর্থ হয় বর্ণ। হরিজনদের ক্ষেত্রে এই কাস্ট বা তফসিলি শব্দ প্রয়োগ করা হয় বর্তমান ভারতে।
একই ধর্ম, একই গায়ের রং, একই ভাষা, একই সমাজের হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় শ্লোক সৃষ্টি করেছে বিশাল ব্যবধান! ভারতে বর্তমান ক্ষমতায় থাকা বর্ণবাদে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আমলে দলিতরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্তরোত্তর তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা বেড়েই চলেছে। হত্যা, ধর্ষণ পরিণত হয়েছে তাদের নিয়তিতে। মামলা না নেওয়া, হেনস্তা করা এবং অন্যান্য প্রতিকূল অবস্থার পরেও পরিসংখ্যানে দলিতদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের পরিমাণ উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে (২০১৪ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানে। এরপর ধারাণা করা হয় কৃত্রিমভাবে রিডিউস করা হয়েছে।)। তাহলে প্রকৃত তথ্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে?
দলিত মানবাধিকারকর্মী PG Ambedkar বলেছেন, "এটি লক্ষণীয় যে, দলিতদের অত্যাচারের উপর গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া-সত্ত্বেও SC/ST (অত্যাচার প্রতিরোধ/Prevention of Atrocities) Act-এর অধীনে মামলা নেওয়ার পরিমাণ সুস্পষ্টভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ২০১৩ সালে এই আইনের বিপরীতে নিবন্ধিত মামলার পরিমাণ ছিল ১৩,৯৭৫টি, যা ২০১৫ সালে ১৩৩% হ্রাস পেয়ে ৬,০০৫টিতে এসে ঠেকেছে। তথ্য-উপাত্তসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেখানে অন্যান্য বিষয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে দলিতদের পক্ষ থেকে মামলার পরিমাণ এভাবে কমে যাওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। খুব বেশি হলে এমনটি হতে পারে যে, তথ্য-উপাত্তে কৃত্রিম নিম্নমুখিতা আনতে পুলিশকে POA-এর অধীনে মামলা কম গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া আছে। না হয় এটা কীভাবে সম্ভব যে, বছরের পর বছর সারা দেশের অপরাধ বৃদ্ধিই পেয়ে যাচ্ছে অথচ ২০১৪ সালের পর থেকে হঠাৎ দলিতদের ওপর হামলার পরিমাণ হ্রাস পেতে শুরু করেছে?"
১৯৬০ সালের ১ ডিসেম্বর। গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ। মঞ্চে উঠলেন আরএসএস নেতা Madhav Sadashivrao Golwalka, উঠেই আবৃত্তি করলেন তার কবিতাখানি, "আজ আমরা অজ্ঞতার কারণে বর্ণপ্রথার বিরোধিতা করি। তবে এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি দুর্দান্ত চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। সমাজের কিছু লোক বুদ্ধিজীবী, কেউ কেউ উৎপাদন বিশেষজ্ঞ এবং কেউ সম্পদ অর্জনে অনেক এগিয়ে, এদিকে কেউ আবার প্রচণ্ড পরিশ্রমী। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই সমাজে চারটি বিস্তৃত বিভাজন দেখেছিলেন। বর্ণ ব্যবস্থার মানেই হলো সেই বিভাজনগুলোর যথাযথ সমন্বয় ও বংশগত বিকাশের মাধ্যমে একজন ব্যক্তিকে উপযুক্ত খাতে সর্বাধিক দক্ষতার সাথে উপস্থাপন করা। এছাড়া আর কিছুই নয়। এই ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে জন্মের আগে থেকেই প্রতিটি ব্যক্তির জন্য জীবিকার মাধ্যম নিশ্চিত থাকে।"
হিন্দু বর্ণ প্রথায় একজন শূদ্র জন্মগতভাবেই শূদ্র। শূদ্র কখনো উচ্চ বর্ণে পরিণত হতে পারবে না। তবে এই মহান (!) ব্যক্তি তারও একটা সলিউশন বের করে। শূদ্রদের গিনিপিগ হিসেবে কল্পনা করে! সে বলে, "আজকাল ক্রসব্রিডিং-এর পরীক্ষা নিরীক্ষা কেবল পশুপাখির উপর করা হয়। তথাকথিত আধুনিক বিজ্ঞানীরা আজও মানুষের উপর এই ধরনের পরীক্ষা করার সাহস দেখান না। যদি আজ কিছু মানুষের মাঝে ক্রসব্রিডিং দেখাও যায় তাহলেও এটি কোন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল নয় বরং শারীরিক লালসার ফলাফল। এবার আসুন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই খাতে কেমন পরীক্ষা চালিয়েছিলেন তা দেখা যাক। ক্রসব্রিডিংয়ের মাধ্যমে একটি উন্নততর মানবপ্রজাতি তৈরির লক্ষ্যে উত্তরের নম্বুদ্রি ব্রাহ্মণরা কেরালাতে বসতি স্থাপন করেছিল এবং তাদের সমাজের জন্য একটি বিধি প্রণয়নও করেছিল। নম্বুদ্রি পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্ররা কেবলমাত্র কেরালার বৈশ্য, ক্ষত্রিয় অথবা শূদ্র সম্প্রদায়ের কন্যাদের বিয়ে করতে পারত। আরেকটি সাহসী নিয়ম ছিল—যেকোনো বর্ণের বিবাহিত মহিলাকেই তার প্রথম সন্তান অবশ্যই নম্বুদ্রি ব্রাহ্মণ পুরুষ দ্বারা জন্ম দিতে হবে। তারপরেই কেবল তারা নিজের স্বামী দ্বারা সন্তান জন্ম দিতে পারতেন। আজকের দিনে এই পরীক্ষাকে ব্যভিচার বলে গণ্য করা হবে। কিন্তু ব্যাপারটি সেরকম কিছু না, কারণ এই নিয়মটি শুধুমাত্র প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।"
১৭ জানুয়ারি ২০১৬। আম্বেডকর ছাত্র সমিতির একজন ছাত্র আত্মহত্যা করে। রোহিত চক্রবর্তী ভেমুলা। হায়দারাবাদ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী। তিনি Caste নামে একটি বইও লিখেছিলেন। তার সুইসাইড নোট মোদী শাসনামলে দলিতদের উপর নির্যাতনের সাক্ষ্য বহন করে। তার আত্মহত্যার পরদিন অর্থাৎ ১৮ জানুয়ারি একজনের মন্তব্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আর্টিকেলে প্রকাশিত হয়। মন্তব্যটি ছিল, "দারুন স্বস্তির ব্যাপার। নিম্নজাতের নোংরা হরিজন অপদার্থটা আত্মহত্যা করেছে। প্রার্থনা করি, সবকটা নিচু জন্মের লোকের একই পরিণতি ঘটুক।"
শূদ্র কারা? দ্রাবিড়রা। দ্রাবিড় কারা? এই ভারত উপমহাদেশের মূল জনগোষ্ঠী। যারা উড়ে এসে জুড়ে বসা আর্যদের বিরুদ্ধে লড়ে গেছে শতাব্দীকালব্যাপী। এখনও যে ধারা অব্যাহত আছে। আর্যদের স্থান দখল করেছে বর্ণবাদী উগ্র হিন্দু এবং দ্রাবিড় দলিত নিষ্পেষিত শূদ্র। ভারতের সংখ্যালঘুরাও এই সফরে তাদের সঙ্গী। কে জানে হয়তো ভারতের অজস্র স্থানে কোন দলিত এ মুহূর্তেও চিন্তা করতেছে সেই ছেলেটির মতো, "আম্মা, কাদাভুলিন পাদাংগল অসুথ্থমানাভায়া? অসুথ্থমিল্লাই এনড্রাল নাম্মা এন থিন্ডাথ্থাগাথাভার্গুলো?"
উচ্চবর্ণের কোন হিন্দু হয়তো তাকে জবাবে একটি গল্প শোনাবে। দ্রোণাচার্যের গল্প। যার নামে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে হরিয়ানা সরকার বিশিষ্ট শহর গুড়গাঁও এর নাম পরিবর্তন করে গুরুগ্রাম রাখে। দ্রোণাচার্য তার ছাত্র অর্জুনকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুকধারী হওয়ার। এদিকে একলব্য, যে ছিল একজন দলিত বালক। একলব্য নিম্নবর্ণে জন্মাবার কারণে এবং রাজপুত্রদের সাথে শিক্ষা নেওয়ার অনুপযুক্ত হওয়ায় দ্রোণাচার্য তাকে লাথি মেরে বের করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সে একাগ্রতার সাথে অর্জুনের থেকেও শ্রেষ্ঠ ধনুকধারীতে পরিণত হয়। এ কথা অর্জুন জানতে পেরে প্রচন্ড বিরক্ত হয়। দ্রোণাচার্য অর্জুনকে প্রশান্ত করতে একলব্যের কাছে গিয়ে গুরুদক্ষিণা হিসেবে তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলটি চায়! একলব্য শুধু আঙ্গুল কেটেই ক্ষান্ত হয়নি গুরুকে সম্মান জানাতে ক্ষতস্থানে লবনও ঘষে! মূলত দ্রোণাচার্য একলব্যকে তার বর্ণগত অবস্থান জানাতেই এই কাজ করেছিলেন!!
***
রেফারেন্স:
১. John King Fairbank and Merle Goldman, China: A New History (Second Enlarged Edition), Chapter 05- The Paradox of Song China and Inner Asia, Subpoint- The Symbiosis of Wen and Wu.
২. Plato, The Republic, https://www.sciencetheearth.com/uploads/2/4/6/5/24658156/plato_-_the_republic.pdf, Introduction and Analysis part.
৩. Frank S. Fanselow, The Genesis of Hindu-Muslim Communalism in Tamilnadu: The Minakshipuram Mass Conversions of Harijans to Islam.
৪. অনুবাদক: যদুনাথ ন্যায়পঞ্চানন এবং ভরতচন্দ্র শিরোমণি, প্রকাশক: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মনুসংহিতা।
৫. ডক্টর তারা চাঁদ, অনুবাদক: এস. মজিব উল্লাহ, ভারতীয় সংস্কৃতিতে ইসলামের প্রভাব।
৬. ড. জিয়াউর রাহমান আজমি, অনুবাদক: মহিউদ্দিন কাসেমী, হিন্দু বৌদ্ধ জৈন শিখ ধর্মের ইতিহাস।
৭. ড. শামসুল ইসলাম, অনুবাদক: তাসনিম মাহমুদ, আরএসএস: জাতীয়তাবাদের আড়ালে ফ্যাসিবাদ।
৮. Meenakshipuram: Harijans flip-flop between Islam and Hinduism, Kavitha Shetty, India Today.
৯. সারানুবাদ: রাজশেখর বসু, মহাভারত।
১০. ড. জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহাকাব্য ও মৌলবাদ।
১১. ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম, ইসলাম ও অন্যান্য মতবাদ।
১২. ড. আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপস, অনুবাদক: মাস'উদ শারীফ, মোদাসসের বিল্লাহ, সানজিদা শারমিন, কবির আনোয়ার, স্রষ্টা ধর্ম জীবন।
১৩. প্রকাশক: রমানাথ ঘোষ, আফ্রিকার সাহিত্য।
১৪. মাওলানা উবায়দুল্লাহ মালিরকোটলায়ি রহ. (পূর্বনাম: অনন্ত রাম), অনুবাদক: আব্দুল্লাহ আল ফারুক, সনাতন হিন্দুধর্ম ও ইসলাম।
১৫. গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস।
১৬. What's brewing in Kanyakumari: Evangelist officer, communal flashpoint, Viju Cherian, Hindustan Times.
১৭. আল বিরুনী, অনুবাদক: মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস, ভারততত্ত্ব (তাহকিক-ই হিন্দ)।
১৮. উইকিপিডিয়া/ Wikipedia.
১৯. Encyclopedia Britannica.
২০. Bharatpedia.