অধুরা
১৬ জুলাই,
আষাঢ়ের মেঘে ঢেকে গেছে আকাশ। গুমোট আবহাওয়া। বাতাসও যেন আলস্য মেখে বসে আছে, বোধহয় আজ আর বইবে না।
রান্নাঘরে বসে সিদল ভর্তা তৈরি করছেন মনোয়ারা বেগম। হাত চলছে, কিন্তু বেড়ার ফাঁক গলে দৃষ্টি বারবার ছুটে যাচ্ছে আকাশের দিকে। মনটা ভারী অস্থির। দেশের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। রাজনীতি তিনি খুব বেশি না বুঝলেও এটুকু ঠিক বোঝেন, এই সরকারের বিরুদ্ধে যারা যায়, দুর্ভোগ তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হতেই গলা চড়িয়ে মেয়েকে ডাকলেন,
“সুমিইইইই…”
ধিমে তালে এসে রান্নাঘরে উঁকি দেয় মেয়েটি। হাতে তিন গোছা চুল, বেশ গুছিয়ে বেণী করছে সে। তাকে দেখে মনোয়ারা বললেন, “তোর ভায়াক একটা কল দে। আল্লায় জানে কনে কী করচে!”
“এই যে এলায় ফোন দিলাম, তুলিল না। আম্মা এ্যালা চিন্তা করে না, ভাইয়া কত ব্যস্ত মানুষ! কত পড়ালেখা, কত কাম তার! এত ঘন ঘন কি ফোন দেওয়া যায়?"
“তোর ভায়াক নিয়া মোর বড় চিন্তা লাগচে। আল্লাহ ছাওয়ালটাক জতন করি থুক।” মনোয়ারার গলা বুজে আসে।
“ভাইয়াক আল্লাহ অনেক বড় মানুষ বানাইবে আম্মা। দেখবা একদিন ভাইয়ার নিজের গাড়ি হইবে। ধবধবে সাদা রঙ্গের গাড়িত চড়ি বাড়ীর সামনে আসি নামিবে। নিজে পায় নামি আসিবে গাড়ি থাকি। উফ আম্মা! আমার ভাবতেই কী যে আনন্দ লাগচে!"
“হইছে যা। চুল মেলিয়া পাক ঘরত আসে না।” কিঞ্চিৎ উষ্মা দেখালেন মনোয়ারা।
ঠিক তখনই ভেতর ঘরে ফোনটা সশব্দে বেজে উঠলো। তড়িঘড়ি করে ছুটে গেলেন তিনি। পেছন পেছন ছুটলো সুমিও। ছেলের নাম দেখে ফোনটা তুলে নিলেন। অবশেষে এই বুঝি সাঈদের মনে পড়লো ঘরের কথা!
ফোন কানে ধরে কিয়ৎক্ষণ ওপারের বার্তা শুনে হাটুভেঙে ধপ করে মাটিতে বসে পড়েন মনোয়ারা। অপরিচিত কণ্ঠটা এমনতর নিষ্ঠুর দুঃসংবাদ দেবে জানলে যেকোনো মূল্যে ঘড়ির কাঁটা থামিয়ে দিতেন তিনি। সময়কে আটকে দিতেন যখন সাঈদ ঘুমিয়ে ছিলো কাঁথা জড়িয়ে। মুহূর্তের জন্যও ছেলেকে যেতে দিতেন না চোখের আড়ালে।
***
গভীর রাত,
অ্যাম্বুলেন্সের তীব্র সাইরেনে চমকে ওঠে সুমি। জানালা গলে লাল-নীল আলোটা এসে পড়েছে ঘরের দেয়ালে। তড়িঘড়ি সে ছুটে যায় বাইরে। লাল, ভেজা চোখগুলো অধীর হয়ে চেয়ে আছে গেটে এসে থামা সাদা রঙের গাড়িটার দিকে।
অবুঝ মনটা এখনো বিশ্বাস করতে চায় না দুপুরের অনাকাঙ্ক্ষিত কল। তার মনে হয়, ভাই এখনই গাড়ি থেকে নামবেন। তাকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলবেন, “কীরে সুমি? গাড়িটা কেমন হইলো? পছন্দ হইচে তোর?”
তারপর পুরো পরিবার এই রাতেই গাড়ি চড়ে গ্রামের রাস্তায় ঘুরতে বের হবে। ক্ষুধা লাগলে তবেই বাড়ি ফিরবে। সিদল ভর্তা আর গরম ভাতের পাতে জমবে চেনা আড্ডা।
চোখের কিনারে পানি জমে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে সুমির। সেই আবছা চোখেই সে দেখল, চার-পাঁচজন মানুষ ধরাধরি করে সাদা কাফনে মোড়া লাশটি নামিয়ে আনছে। কারো কান্নার তীব্র শব্দ সুমির কানে ফুটছে।
টুপ করে দু'ফোঁটা জল কপোল বেয়ে ঝরে যায়, ঠিক যেভাবে ঝরে গেছে তার প্রিয় ভাই।
(সমাপ্ত)