ওগো প্রেয়সী
রাইসার ঘুম ভাঙলো শীতল অনুভূতি নিয়ে। কার্তিকের এই ভোরবেলাতেও যে এমন জাঁকানো শীত নামতে পারে, তার ধারণা ছিল না।
এমনিতেই সে ভীষণ শীতকাতুরে, তার ওপর কাঁথা গায়ে না দিয়েi ঘুমিয়েছে। রাতে যখন বৃষ্টি শুরু হয়েছিল তখনও মনে হয়নি শেষরাতে এমন শীত পড়বে। রাইসার মনে হলো, আমি তো কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুইনি। তাহলে কাঁথা এলো কোথা থেকে? এটা তাহলে নিশ্চয়ই আহমাদের কাজ।
রাইসা বিছানার ওপাশটাতে হাত রাখল। বিছানা খালি। আহমাদ নেই। বাথরুম থেকে টুপটাপ জল পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। আহমাদ নিশ্চয়ই ওযু করছে। তাহলে কি ফজরের আযান পড়ে গেছে? ওহ আল্লাহ! এই শীত শীত অনুভূতিতে কাঁথা মুড়িয়ে একটু শান্তিতে ঘুমাব, তা না। এখন যাও আবার ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ওযু কর। কথাগুলো ভাবতেই রাইসার শরীরে কাটা দিল। কাঁথার ভেতর আরও সেদিয়ে গেল রাইসা।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে আহমাদ দেখল রাইসা তখনও ঘুমে কাদা হয়ে আছে। ঘরের ভেতর হাল্কা আভার বাতি জ্বলছে। দখিনের খোলা জানালায় বয়ে যাচ্ছে মৃদু বাতাস। মাঝরাতে বৃষ্টি হলেও আকাশ এখন ঝকঝকে নীল। এক টুকরো চাঁদ উঁকি দিচ্ছে মেঘের কোলে ভেসে ভেসে। মৃদু জোছনা ছড়িয়ে পড়েছে বারান্দা থেকে ভেতর ঘরে। রাইসাকে ডাকবে কি ডাকবে না—ভেবে পাচ্ছে না আহমাদ। একবার মনে হলো মসজিদ থেকে এসেই নাহয় ডাকা যাবে। ফজরের ওয়াক্ত থাকবে তখনও। আপাতত ও ঘুমিয়েই থাকুক নাহয়। ভাবতে ভাবতে গায়ে জোব্বা চাপিয়ে নিলো আহমাদ। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যেতেই পেছন থেকে ডাক পড়ল রাইসার।
‘এই শোনেন।’
‘জেগে গেছো তুমি? আমি আরও ভাবলাম মসজিদ থেকে এসে ডেকে তুলব তোমায়। আচ্ছা বল, কী বলবে?’
‘আজকে আমার নামাযটা একটু পড়ে দেন না! আমার খুব শীত করছে।’
ফিক করে হেসে ফেলল আহমাদ। বিছানার কাছে এগিয়ে এসে রাইসাকে জড়িয়ে ধরল বুকের কাছে। চেষ্টা করল খানিকটা উষ্ণতা দেওয়ার।
‘শীত কি কমেছে এখন কিছুটা?’
রাইসা চোখ বন্ধ রেখেই বলল, ‘উঁহুঁ, কমেনি। আরও খানিকটা সময় আপনার বুকে আমাকে জড়িয়ে রাখুন। আহমাদ বললো, ‘নামাযের সময় চলে যাচ্ছে যে! আগে নামাযটা জামাতে আদায় করে তো আসি।’
‘এই এই, দিন না একদিন একটু আমার নামাযটা আদায় করে! আরেকদিন আপনারটা নাহয় আমি আদায় করে দেব।’
‘আচ্ছা বেশ! মসজিদে গিয়ে আগে তোমারটা আদায় করব, এরপর আমারটা কেমন?’
রাইসা হাসলো, ‘ঠিক আছে! আমার ওলি আউলিয়া জামাই।’
আহমাদ আর কথা বাড়াল না। সোজা মসজিদের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ল। কারণ সে জানে, রাইসা ঠিকই উঠে নামাজ আদায় করে নেবে। ইবাদতের ব্যাপারে রাইসা তার থেকেও অধিক সচেতন। অগ্রগামিনী।
জামাত শেষ করে আহমাদ বাসায় ফিরে দেখল রাইসা জায়নামাজেই সিজদারত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। বোধহয় ঘুমাচ্ছে। আহমাদ এগিয়ে এসে রাইসাকে ডাকল, ‘এই রাইসা, রাইসা? আরে এভাবে কি কেউ ঘুমায়? ওঠো, বিছানায় শোবে চল...’
জায়নামাজে উঠে বসল রাইসা। চোখ জোড়া ঘুমে ঢুলুঢুলু। রাইসাকে দেখতে এখন একেবারে নিষ্পাপ শিশুর মত লাগছে। ভোরের স্নিগ্ধ আলোর মত কোমল ওর মুখাবয়ব। অনেক কষ্টে চোখ মেলে তাকাল রাইসা। আহমাদ ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করল, ‘এই এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন আমার দিকে?’
আহমাদ হাসি জড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘পৃথিবীতে কতশত সুন্দরী রমণীরা আছেন। কিন্তু আমার চোখে তুমিই সেরা সুন্দরী। বিশ্বসুন্দরী৷ এমন সুন্দর মানুষ দেখার সৌভাগ্য কি আর সবার হয়, বলো? তাই তো এভাবে তাকিয়ে আছি।’
‘এই এই, মাইর খাইছেন?’
‘বিশ্বসুন্দরীর হাতে মাইর খাওয়ার সৌভাগ্য হেলায় হারানো যায় না। আমি প্রস্তুত।’
‘এই যান। আপনিও না ভীষণ দুষ্টু স্বভাবের। অবশ্য রোমান্টিকও বটে। আল্লাহ তাআলা আপনার মতন স্বামী ভাগ্যে রেখেছেন, শুকরিয়া আলহামদুলিল্লাহ।’
‘আমিও লাখো কোটি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি সেই সুমহান স্রষ্টার প্রতি। যিনি আমাকে তোমার মতন একজন পরহেজগার নারীকে আমার পত্নী হিসেবে বিবেচিত করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ। সুম্মা আলহামদুলিল্লাহ।’