‹ হোম
ছোটোগল্প

ওপাশে কেউ একজন

এনামুল হক ইবনে ইউসুফ

মেসের চারজনই পুজার ছুটিতে বাড়ি গেছে। পাঁচ রুমের ফ্ল্যাটে আজ রাতে কেবল আমি একা।

​অফিস থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে গেলাম। রাতে একা রান্না করার ঝামেলায় না গিয়ে ডিম ভেজে ভাত খেয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

​কিন্তু ডাইনিং টেবিলে পা দিতেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। টেবিলের ওপর প্লাস্টিকের জগে পানি একদম কানায় কানায় ভরা। মেসের নিয়ম অনুযায়ী ফিল্টার থেকে জগে পানি ভরার দায়িত্ব ছিল শাকিলের, কিন্তু ও তো সন্ধ্যের দিকে বাড়ি রওনা দিয়ে গেছে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, জগটার গায়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম—যেন ফ্রিজ থেকে ঠিক এইমাত্র বের করে টেবিলে রাখা হয়েছে।

​আমি দ্রুত মেইন দরজার কাছে গেলাম। ভেতরের ভারী ড্রপ-লকটা ঠিকভাবেই আটকানো। ছিটকিনিতে কোনো হাত পড়েনি।

​চোর বা অচেনা কেউ ঢুকলে ড্রয়িংরুমের ল্যাপটপ বা দামি জিনিস নিত, পানি বের করে টেবিলে সাজিয়ে রাখত না।
​একটা সন্দেহ মাথায় খচখচ করতে লাগল কেউ কি ট্রিপ বাতিল করে ফিরে এসেছে?

​আমি করিডোরে এসে বড় করে ডাকলাম, ‘কেউ আছিস? শাকিল? আসিফ?’

​কোনো উত্তর নেই। শুধু করিডোরের শেষ মাথায় বাথরুমের এক্সহস্ট ফ্যানটার মৃদু ভোঁ ভোঁ শব্দ।

​আমি চারটা রুমের দরজাই এক এক করে চেক করলাম। তিনটা রুমের তালা বাইরে থেকে যেমন লাগানো ছিল, তেমনই আছে। কিন্তু শেষ রুমটা—শাকিলের রুমের তালাটা খোলা। তবে দরজার পাল্লাটা পুরোপুরি বন্ধ, ভেতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া।

​আমি দরজায় তিনটে শক্ত টোকা দিলাম। ‘শাকিল? ভেতরে আছিস?’

​কোনো সাড়াশব্দ নেই। কিন্তু দরজার ঠিক নিচ দিয়ে মেঝের ফাঁকটুকুতে চোখ যেতেই রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল।

​ভেতরের লাইটটা বন্ধ। কিন্তু দরজার ঠিক অপর পাশে—মেঝের ওপর একজোড়া খালি পায়ের পাতার ছায়া। মানুষটা দরজার হ্যান্ডেল ধরে নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কোনো জবাব দিচ্ছে না।

​আমি এক পা পিছিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে শাকিলকে ডায়াল করলাম।
​ প্রথম কলেই শাকিল রিসিভ করল।
‘হ্যাঁ নাঈম, বল! মাত্র যমুনা সেতু পার হচ্ছি, নেট পাচ্ছিলাম না এতক্ষণ।’
​আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, ‘শাকিল, তোর রুমের চাবিটা কি তোর কাছে না?’
​শাকিল খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘না রে, আমার চাবির রিংয়ে আলমারির চাবি থাকে না? তাই বের হওয়ার সময় মেসের দারোয়ান মামাকে দিয়ে এসেছিলাম, বলেছিলাম তোকে দিয়ে দিতে। মামা তোকে চাবিটা দেয়নি?’

​আমার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। কারণ ঠিক দশ মিনিট আগে, গেট দিয়ে ঢোকার সময় দারোয়ান মামাই আমাকে দেখে হেসে বলেছিলেন—
‘নাঈম ভাই, আপনিও গ্রামে গেলেন না? পুরো বিল্ডিংয়ে আজ কিন্তু আপনি একাই!’

​তাহলে দরজা ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে আমার ঠিক এক ফুট সামনে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কে?