‹ হোম
প্রবন্ধ

গণকদের প্রতি বিশ্বাস : সাইকোলজি ও অনিশ্চয়তার রহস্য

মোহাম্মদ নাহিদ আদনান

এস্ট্রোলজার বা গণকদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি ঘটনা বলি আপনাদের। বেশ কয়েক বছর আগে একটা পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন পড়ি। পুরো লেখাটার সারসংক্ষেপ নিজের মতো তুলে ধরলাম:
মুন্সীগঞ্জের ছবিলপুর গ্রামে এক নতুন ব্যক্তিকে নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষেরা ভীড় জমিয়েছে ঐ ব্যক্তিকে দেখতে। শুনতে পাওয়া গেছে তার নাকি বিশেষ ক্ষমতা আছে। সে কোন মানুষের হাত দেখেই তার সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দিতে পারে। তারই সত্যতার সন্ধানে সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হয়। বেশ কয়েকদিনের পর্যবেক্ষণে যা উঠে আসে তা একই সাথে অবাক করার মতো আবার হাস্যকরও বটে।এই ব্যক্তি বিভিন্ন মানুষের হাত দেখে তাদের ব্যাপারে বিভিন্ন জিনিস বলে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল ৮৮-৯০% প্রিডিকশনই মিলে নিই। কিন্তু এতে মানুষের আগ্রহ বা বিশ্বাস কিন্তু কমে নিই। বরং দিন দিন আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষের ভীড় বেড়েই চলেছে।

বলে রাখি এই ঘটনা বা প্রতিবেদন পুরোটাই আমার বানানো। কিন্তু ঘটনার যে মূলভাব তা বলে গিয়েছেন ইটালির স্কলার Francesco Guiciardini। তার মতে,
"জ্যোতিষীরা কতই না সুখী! যারা একশো মিথ্যার মধ্যে একটি সত্য বললেও বিশ্বাস পায়, অথচ অন্যরা (সাধারণ মানুষ) একশো সত্যের মধ্যে একটি মিথ্যা বললেই সব বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।"

যদিওবা আমার বর্ণনাকৃত ঘটনাটি মিথ্যে কিন্তু আমাদের আশেপাশে এরকম অহরহ ঘটনা ঘটে চলছে এবং ইতিহাসেও এমন বহু ঘটনার সাক্ষী। তবে প্রশ্ন হতে পারে, ভুয়া গণক হওয়া সত্ত্বেও কেন এত এত মানুষ বিশ্বাস করে অনুসরণ করে এদের। এর উত্তর জানতে আমাদের বুঝতে হবে "The psychology behind human believenesses "।

সাইকোলজির ভাষায় "Confirmation Bias" নামক একটি টার্ম আছে।Confirmation Bias অনুসারে মানুষ সেসকল জিনিস শুনতে ও বিশ্বাস করতে ভালোবাসে যা সে পূর্বে থেকেই বিশ্বাস ও পছন্দ করে আসছে।তাছাড়া মানুষ স্বভাবত অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না;যেকোনো উপায়ে হোক সবকিছুর একটি নিশ্চিত রুপ দেখতে পছন্দ করে।

আবার বিশ্বাসের সাইকোলজি এটাও বলে মানুষ নিকট ভবিষ্যৎ নিয়ে সবসময়ই সন্ধিহান থাকে। এই বাস্তবতা আমরা প্রায়সই অনুভব করি। বিশেষ করে পরীক্ষার রেজাল্টের আগে আমাদের মনে এক অজানা অস্থিরতা কাজ করে।আপনি জানেন আপনার পরীক্ষা ভালো হয়েছে। তাও আপনি আপনার রেজাল্ট নিয়ে কিছুটা অস্থির। ঠিক সে মুহুর্তে ধরুন আপনার সামনে দিয়ে আপনার বন্ধু হেটে যাচ্ছিল। সে আপনার অস্থিরতা দেখে আপনাকে শান্তনা দিয়ে বলল,আরে তুই ভালো পরীক্ষা দিয়েছিস।ইন শা আল্লাহ তোর রেজাল্ট ভালো আসবে। এবং দেখা গেল আসলেই আপনার রেজাল্ট ভালো হয়েছে। এখানে কিন্তু আপনার বন্ধু প্রফেসি করে নিই। বরং আপনার সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে সে পূর্ব থেকেই অবগত তাই সে প্রিডিকট করেছে আপনার ভালো রেজাল্ট নিয়ে।

কিন্তু সিনারিও একটু বদলে দিই।আপনি আপনার রেজাল্ট নিয়ে অনিশ্চিত ও চিন্তিত দেখে এক গণকের কাছে গেলেন আপনার আগাম রেজাল্ট সম্পর্কে জানতে। সে আপনাকে সম্ভব্য কি বলতে পারে? ধরে নিলাম গণকের জবাব হবে, " ভালো রেজাল্ট করবি।" এমন জবাব খুবই স্বাভাবিক।কারণ আমরাও ভালো রেজাল্টেরই প্রত্যাশি (কারো কাছ থেকে প্রত্যাশিত কিছু শুনলে তার প্রতি বিশ্বাস বাড়ে)। তাও কথার কথা ধরলাম এমনটা ত সবসময় মিলে যাবে এমন না। সেসবক্ষেত্রে আগেই বলেছি মানুষ মূলত গণকদের এজন্য বিশ্বাস করে এই ভেবে না যে তারা সঠিক বা ভুল ভবিষ্যৎ বানী করবে বরং মানুষের এই গণকেদের প্রতি বিশ্বাস বা আগ্রহের মূল কারণ ৩ টি।

মানুষ তার অনিশ্চয়তা দূরীকরণ করতে চায়, নিকট ও কৌতূহলী ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চায় এবং প্রত্যাশিত কোন কিছু শুনতে বা জানতে চায়। আর একজন গণক এ তিনটি ক্রাইটেরিয়াই ফুলফিল করে দেখেই মানুষ গণকদের শরণাপন্ন হয়।

তাছাড়া খেয়াল করে দেখবেন গণকদের সমাজে একজন জ্ঞানী মোড়াল বা যে সবার থেকে ভিন্ন এমনভাবে রিপ্রেন্ট করা হয়। যার কারণে গণকদের বেশিরভাগ কথাই মানুষ নির্বিচারে গ্রহণ করে নেয়। এই যে কর্ণধারের কথায় কর্ণপাত করার ব্যপারটাকে Robert B. Cialdini তার লেখা "The Psychology of Persuasion" বইয়ে উল্লেখ করেন।তিনি তার বইয়ে কর্তৃত্ব বিস্তার বিষয়ে ছয়টা নীতির কথা উল্লেখ করেন।

○Reciprocity (পাল্টা উপকার বা প্রতিদান)
○Commitment and Consistency (অঙ্গীকার ও সামঞ্জস্য)
○Authority (কর্তৃত্ব)
○Social Proof (সামাজিক প্রমাণ)
○Liking (পছন্দ)
○Scarcity (অভাব বা সংকীর্ণতা)

ছয়টা নীতির ৪ নংটা মূলত গণকদের নিয়ে ছিল।

পুনশ্চঃ

"What is lotted cannot be blotted" অর্থ হলো: ভাগ্যের লিখন না যায় খন্ডন। এটি একটি স্বত:স্ফূর্ত সত্য বলে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বাস করে আসছে মানুষ। প্রাচীন ফিলোসোফি থেকে এই ধারণার আগমন। যেমনঃ ফিলোসোফির একটা বিষয় আছে "Hard Determinism" নামে। যা বলে,মানুষের স্বাধীন ইচ্ছে শক্তি নেই। আমরা যা ইচ্ছে করি তা পূর্বের কোনো কজের ইফেক্ট।এর বিপরীতেও বেশ কিছু ফিলোসোফার স্ট্যাটমেন্ট দিয়েছেন।

এটা ঠিক যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কজের ইফেক্টের কারণে মানুষের ইচ্ছা প্রভাবিত হয়। কিন্তু মানুষের ইচ্ছা পরিবর্তনশীল এবং আনডিফাইন। তাই এটা বলা পুরোপুরি ভুল যে, সবার ইচ্ছে শক্তি এবং ইচ্ছার কারণে ঘটিত কাজের ফলাফল সর্বদা পূর্ব নির্ধারিত। মানুষের কর্মফল তার ইচ্ছা,শ্রম,পারিপার্শ্বিক অবস্থাসহ অসংখ্য ফ্যক্টরের উপর নির্ভর করে।তাই এটা বলা ভুল হবে না যে, What is Lotted sometimes can be blotted.

-সমাপ্ত-