‹ হোম
প্রবন্ধ

২৩ বছরের বন্দিত্ব

সাইয়েদ আবদুল্লাহ আল আমিন

ঠক ঠক!
আফিয়া সিদ্দিকি তখন বাসায় একা। বাইরে কে আছে দেখার জন্য তিনি ডোর ভিউয়ারে চোখ রাখতেই দেখতে পান—কালো পোশাক পরিহিত কয়েকজন লোক, হাতে হ্যান্ডগান। তারা কেন এসেছে, তা বুঝতে না পেরে তিনি দ্রুত স্বামী আমজাদ খানকে ফোন করেন।
ওই সময় আমজাদ খান অফিসে ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি ফোন রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গেই দেখেন—তার অফিসেও একই ধরনের দু’জন লোক উপস্থিত। এ ধরনের লোকদের আমরা মাঝেমধ্যে বিভিন্ন হলিউড সিনেমা কিংবা প্রেস ব্রিফিংয়ে দেখে থাকি। কালো পোশাক পরিহিত এই লোকদের বুকের উপর মোটা অক্ষরে লেখা থাকে এফবিআই (FBI-Federal Bureau of Investigation)। নামে ‘বিশ্বস্থতা, সাহস, বিশুদ্ধতা’ এই তিনটি স্লোগান নিয়ে কাজ করলেও পুরো বিশ্বজুড়ে আমেরিকা তার সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায় এই এফবিআইয়ের মাধ্যমেই।
সুতরাং, আফিয়ার বাসা এবং আমজাদ খানের অফিসে FBI-এর উপস্থিতির পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। কিন্তু সেই কারণটা কী?
…..
৯/১১-এর হামলার পর বিশ্ববাসী এমন এক সত্যের সাথে পরিচিত হয়, যা এর আগে অনেকের কাছেই অকল্পনীয় ছিল। আমেরিকা, যে নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও ‘অপরাজেয়’ শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে, আল-কায়েদা সেই মিথকে নির্মমভাবে ধূলিসাৎ করে দেয়। এটি শুধু মুষ্টিমেয় কিছু মোল্লার বিচ্ছিন্ন হামলা ছিল না; বরং এটি আমেরিকার আধিপত্যবাদী চিন্তাধারায় এক মৌলিক আঘাত ছিল।
অতএব, আমেরিকা—যে নিজেকে বিশ্বসভ্যতার রোল মডেল ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের মোড়ল মনে করে—এই হামলার পর নিশ্চুপ থাকবে, এমনটি ভাবাও বোকামি হবে।
শুরু হয় ‘সন্ত্রাস দমনের’ নামে বিশ্বব্যাপী সামরিক অভিযান, কঠোর নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ এবং সন্দেহভাজনদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের বিস্তৃত কার্যক্রম। নিরীহ মুসলিম জনগণের ওপর চালানো হয় গণহত্যা, অবৈধ গ্রেপ্তার ও কারাবন্দিত্বের মতো মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড। কিন্তু আমেরিকার দীর্ঘ ইতিহাসে এসব নতুন কিছু ছিল না; বরং ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—১৯৪৬ সাল থেকে গত ৭৩ বছরে আমেরিকা পেশাদারি দক্ষতা আর নির্লিপ্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে পৃথিবীজুড়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ কোটি মানুষ হত্যা করেছে।

৯/১১-এর পরও আমেরিকার এই নীতির বড় কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স’-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত
প্রায় ৪৩ হাজারেরও বেশি আফগান বেসামরিক নাগরিককে আমেরিকা হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ড্রোন ও বিমান হামলার শিকার। এর পাশাপাশি দিনে-দুপুরে আমেরিকা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের ওপর অবৈধ গ্রেপ্তার ও দীর্ঘমেয়াদি আটকের মত গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধও করেছে।

৯/১১-এর পর যেন এক অদৃশ্য আতঙ্ক নেমে এসেছিল মুসলিম পাড়াগুলোতে। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রায়ই শোনা যেত দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ—এফবিআইয়ের উপস্থিতি তখন আর অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। মাঝরাতের অন্ধকারে অনেককেই অজানা জিজ্ঞাসাবাদের নামে আটক করা হতো। এরপর সন্দেহভাজন মানুষদের টেনে নিয়ে যাওয়া হতো এক অদৃশ্য আয়নাঘরে, যেগুলোকে তারা নাম দিয়েছিল ‘ব্ল্যাক সাইট’।

সেখানে বন্দিদের ওপর ওয়াটার বোর্ডিং, স্ট্রেস পজিশন, ঘুম বঞ্চনাসহ নৃশংস পদ্ধতি প্রয়োগ করে কাছে থেকে বিভিন্ন ধরনের স্বীকারোক্তি নেওয়া হতো। আর এই বন্দিদের তালিকায় আফিয়া সিদ্দিকিও ছিলেন—একজন মা, একজন শিক্ষিকা, একজন কুরআনের হাফেজা, পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন মুসলিম নারী—যাঁকে পিষে ফেলা হয়েছিল ক্ষমতার এই নিষ্ঠুর যুদ্ধে!
….
সেদিন আফিয়ার বাসায় হঠাৎ এফবিআই-এর আগমন কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না, বরং এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র লুকয়িত ছিল। আফিয়া সিদ্দিকি ছিলেন ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটি থেকে ‘কগনিটিভ নিউরোসায়েন্স’-এ ডক্টরেট করা একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। ১৯৯৯ সালে তিনি মাস্টার্স শেষ করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘Learning by Imitation’ (অনুকরণের মাধ্যমে শেখা) বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন। এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য এমন একটি শিক্ষাপদ্ধতি তৈরি করা, যাতে তারা পর্যবেক্ষণ ও অনুকরণের মাধ্যমে সহজে শিখতে পারে।
এ ছাড়া আমাদের বোন আফিয়া ছিলেন প্রকৃত কুরআনপ্রেমী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ই তিনি নিজের প্রচেষ্টায় অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ পুরো কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি তিনি বাইবেল ও তাওরাত নিয়েও গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। ফলে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে তাঁর জ্ঞান এতটাই সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে যে, তাঁর বড় বোন ফাওজিয়া সিদ্দিকি তাঁকে মজা করে ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া’ বলে ডাকতেন।
কিন্তু আমেরিকার দৃষ্টিতে একজন মুসলিম নারী ছিল আশঙ্কার বস্তু। তাদের ধারণা ছিল, আফিয়া সিদ্দিকি এমন একজন সায়েন্টিস্ট, যিনি আল-কায়েদাকে বোমা তৈরিতে সাহায্য করেন। এই ধারণা তৈরি হওয়ার পেছনের মূল কারণ ছিল ১৯৯২ সালের বসনিয়ার যুদ্ধ।
….
১৯৯২ সালের ৩রা মার্চ বসনিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় সার্ব বাহিনী ৮ হাজারের বেশি মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে হত্যা করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের সবচেয়ে নৃশংস ও ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত। এমন এক অন্ধকার সময়ে, যখন বসনিয়ার রাস্তাগুলো রক্তে লাল হচ্ছিল, যখন মায়েরা তাদের সন্তানদের শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরছিল—ঠিক তখনই হাজার মাইল দূরে আমেরিকার এক ক্যাম্পাসে বসে আফিয়া সিদ্দিকি টিভির পর্দায় সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখছিলেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ধ্বংসস্তূপ, কান্নারত নারী আর লাশের স্তূপ।

শৈশব থেকেই আফিয়া সিদ্দিকির মন ছিল কোমল ও সহানুভূতিশীল। কারও চোখে জল দেখলেই তাঁর বুকটা ধক করে কেঁপে উঠত। স্কুলে কেউ বিপদে পড়লে সবার আগে ছুটে যেতেন সাহায্যের জন্য। কিন্তু এখন? টিভির পর্দায় বসনিয়ার ভয়াবহতা দেখে তাঁর পুরো শরীর যেন জ্বলে যাচ্ছিল। সারা দিন তাঁর চোখে ভাসত—ক্ষুধার্ত শিশুদের আকুতি, ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা বৃদ্ধদের করুণ মুখ এবং বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের ছবি। রাতের পর রাত তিনি চোখের জল ফেলতেন; কিন্তু মন শান্ত হতো না। আফিয়ার মনে তখন কেবল একটাই চিন্তা—এদের জন্য কিছু একটা করতেই হবে।

সেই সময় আমেরিকায় বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা বসনিয়ার সাহায্যের জন্য তহবিল সংগ্রহ শুরু করে। অনেক মানুষ বসনিয়ার মুসলিমদের পাশে দাঁড়াতে শুরু করে। তাদের দেখে আফিয়াও থেমে থাকেননি। তিনি নিয়মিত মসজিদে যেতেন এবং হালাকায় বসনিয়ার মুসলিমদের দুঃখ-দুর্দশার কথা বলতেন। তাঁর কথায় মানুষ এতটাই আবেগাপ্লুত হতো যে, অনেকেই সাধ্যের চেয়ে বেশি দান করত। তিনি মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে অনাথ শিশুদের জন্য সাহায্য সংগ্রহ করতেন এবং বোঝাতেন, কীভাবে তাদের সামান্য সাহায্য বসনিয়ার মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

সেই সময় আফিয়াই ছিলেন প্রথম নারী, যিনি বসনিয়ার অসহায় মানুষদের জন্য ১ হাজার ডলার সংগ্রহ করেছিলেন। এটি কোনো ছাত্রীর পক্ষ থেকে তহবিল গঠনের ক্ষেত্রে একটি বিশ্বরেকর্ড ছিল। সংগৃহীত এই অর্থ আফিয়া বিভিন্ন দাতব্য সংগঠনের মাধ্যমে বসনিয়ার মুসলিমদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এসব সংগঠনের মধ্যে একটি ছিল ‘আল-কিফাহ রিফিউজ সেন্টার’। এটি তৎকালীন প্রচলিত একটি চ্যারিটি নেটওয়ার্ক ছিল, যার মাধ্যমে তহবিল পাঠানো হতো। কিন্তু ৯/১১-এর পর জানা যায়, এই দাতব্য সংস্থাটি কিছু রেডিক্যাল গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, যারা আল-কায়েদাকে অর্থায়ন করত।

এই ঘটনার কারণেই এফবিআইয়ের নজর পড়ে আফিয়া সিদ্দিকির ওপর। তিনি একদিকে মুসলিম নারী ও মেধাবী সায়েন্টিস্ট, অন্যদিকে কিছু দাতব্য সংস্থার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা—ফলে এফবিআই কোনোভাবেই বিষয়টি এড়িয়ে যায়নি; প্রমাণ হাতে পাওয়ার পরই তারা সরাসরি আফিয়া সিদ্দিকির বাসার দরজায় উপস্থিত হয়।

তবে সেদিন স্বামী আমজাদ খানের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কারণে তারা বাসায় প্রবেশ করতে পারেনি। পরিস্থিতি বুঝে আমজাদ খান দ্রুত তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে আইনজীবীর মধ্যস্থতায় এফবিআই ও আফিয়ার মধ্যে সীমিত কিছু কথা হয়। এফবিআই আফিয়া সিদ্দিকিকে আমেরিকা ছাড়তে নিষেধ করে। কিন্তু এর মধ্যেই আফিয়া সিদ্দিকির ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক আঘাত আসে—প্রথমে আফিয়ার শ্রদ্ধেয় পিতার মৃত্যু এবং পরবর্তীতে স্বামী আমজাদ খানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, যা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদে গড়ায়।
….
৯/১১-এর পর আমেরিকার তথাকথিত ‘সন্ত্রাস দমন’ অভিযানে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচে বেশি ইন্ধন বা সহায়ক ভুমিকা পালন করেছে—পাকিস্তান। পাকিস্তানই আমেরিকাকে নিজের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয় এবং সীমান্ত অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করে বিন লাদেন ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে। এ ছাড়া এই যুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নিয়ে পাকিস্তান ‘আমেরিকা’কে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তাও দিতে শুরু করে।

কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তানের মতো একটি দালাল রাষ্ট্র কি এসব কখনো কোনো স্বার্থ ছাড়া করবে?

আমেরিকা ২০০২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পাকিস্তানকে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর মধ্যে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার ছিল সামরিক সহায়তা এবং প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক সহায়তা। এরপরেও নাপাকিস্তানের কাছে এই অর্থ কম মনে হয়েছে, সে জন্য তারা মার্কিন বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কাছে থেকে আল-কায়েদার সন্দেহভাজন বন্দিদের হস্তান্তরের বিনিময়ে লাখ লাখ আদায় করে। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ নিজেই তাঁর ইন দ্য লাইন অব ফায়ার বইয়ে এই বিষয়ে লিখেছেন,

৯/১১-এর পরই আল-কায়েদার অনেক সদস্য আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেন। তাঁদের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারকে ইঁদুর-বিড়াল দৌঁড় খেলতে হয়। এই বই লেখার সময়েও আল-কা*য়েদা নেতা উসামা বিন লাদেন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। তবে আল-কায়েদার বেশ কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়। আমরা ৬৮৯ জনকে আটক করেছি এবং ৩৬৯ জনকে আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছি। এভাবেই লাখ লাখ ডলার আমরা উপার্জন করেছি।’

৯/১১-এর হামলার পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ পাকিস্তানে ‘বাউন্টি প্রোগ্রাম’ চালু করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, সন্দেহভাজন আল-কায়েদা ও তালেবান নেতাদের গ্রেপ্তারের জন্য স্থানীয় সহযোগীদের আর্থিক পুরস্কার দেওয়া। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা (আইএসআই)-এর এজেন্ট ও সেনাবাহিনীকে ‘সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী’ ধরার জন্য লাখ লাখ ডলার অর্থ দেওয়া হতো। স্থানীয় গোয়েন্দারা শুধু অর্থ পুরস্কারের লোভে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করত।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সাধারণ গরিব পাকিস্তানি, আল-কায়েদা বা তালেবানের সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবু এসব ব্যক্তিকে বিনা বিচারে সিআইএর গোপন কারাগারে বা গুয়ান্তানামো বে-তে পাঠানো হতো। সেখানে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই তারা বছরের পর বছর আটক থাকতেন। নির্যাতনের শিকার হতেন।
এই প্রোগ্রাম শুধু স*ন্ত্রাস দমনের নামে একটি নৃশংস ব্যবসায় পরিণত হয়েছিল, যেখানে মানুষের জীবন ছিল কেবল টাকার বিনিময়ে একটি পণ্য। আর এই জঘন্য লেনদেনের জালেই আফিয়া সিদ্দিকি আটকা পড়েন। পাকিস্তান সরকার মাত্র ৫৫ হাজার ডলারের বিনিময়ে তাঁকে সিআইএর হাতে তুলে দেয়।
….
২০০২ সালে স্বামী আমজাদ খানের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আফিয়া সিদ্দিকি পাকিস্তানে চলে আসেন। ততদিনে তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের মা। পাকিস্তানে এসে তাঁর একটিই স্বপ্ন ছিল—একটি ‘শিক্ষানগরী’ (Education City) গড়ে তোলা; যেখানে মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাবিদদের একত্রিত করে এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম একই সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামি জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এই লক্ষ্যেই তিনি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য কারাচি থেকে ইসলামাবাদ যাচ্ছিলেন।

কিন্তু পথেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আফিয়ার ট্যাক্সি থামিয়ে দেয়। কোনো কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়েই তারা আফিয়া ও তাঁর সন্তানদের জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনে। এরপর আফিয়াকে আইএসআইয়ের একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়, আর আহমাদ ও মারইয়ামকে আলাদা আরেকটি গাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ছোট্ট সুলাইমান? তাঁর বয়স তখন মাত্র ছয় মাস, অথচ তাঁকেও নাপাকবাহিনী নিষ্ঠুরভাবে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

আহমাদ আতঙ্কে ছোট ভাই সুলায়মানের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই, ছোট ভাইয়ের শরীর থেকে রক্ত ঝরছে, কিন্তু সে আর নড়ছে না। আইএসআই বাহিনী আফিয়া, আহমাদ ও মারইয়ামকে আলাদা করে একটি গোপন আস্তানায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে এফবিআই তাদের করাচি থেকে আফগানিস্তানের কাবুলে স্থানান্তর করে। সেখানে বাগরাম কারাগারে আফিয়াকে প্রায় পাঁচ বছর আটক রাখা হয়। রাত-দিন চালানো হয় ওয়াটার বোর্ডিং, স্ট্রেস পজিশন,প ডিপ্রাইভেশন সহ নির্মম অত্যাচার। প্রতিনিয়ত করা হয় গণধর্ষণ। অন্যদিকে মাত্র সাত বছর বয়সী আহমাদকে পাঠানো হয় একটি কিশোর আটককেন্দ্রে। তিন বছর বয়সী ছোট্ট মারইয়ামকে জোরপূর্বক দত্তক দেওয়া হয় জশ ও নাতালি নামের এক খ্রিষ্টান দম্পতির কাছে।
….
দীর্ঘ পাঁচ বছর বন্দি জীবন কাটানোর পর ২০০৮ সালে হঠাৎ একদিন আফগানিস্তানের কাবুল থেকে আফিয়া সিদ্দিকি ও আহমাদকে আটক করা হয়। ঠিক কিছুদিন পর মারইয়ামের খোঁজও পাওয়া যায়। মারইয়াম ও আহমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়, কিন্তু আফিয়া সিদ্দিকির বিরুদ্ধে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগ এবং আফগানিস্তানে অজ্ঞাত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে হামলার পরিকল্পনার নোট উদ্ধারের দাবি তুলে মোট সাতটি মামলা দায়ের করা হয়।

২০০৮ সাল থেকে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আদালতে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ও বিচার কার্যক্রম চলে।
আফিয়ার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছিল, সেগুলো প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি; তবুও বিচারক তাকে দোষী সাব্যস্ত করে দীর্ঘ ৮৬ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।

তখন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে আমাদের এই বোন চার দেয়ালের বন্দিত্বের জীবন কাটাচ্ছেন। মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে প্রতিদিন গণধর্ষণ, স্লিপ ডিপ্রাইভেশন, জিজ্ঞাসাবাদের নামে কঠোর আচরণসহ নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে তাঁকে সময় পার করতে হচ্ছে। তবে এই অসহনীয় যন্ত্রণার মাঝেই এক অবিশ্বাস্যও ঘটনা ঘটে—আফিয়া সিদ্দিকির স্বপ্নে আগমন করেন নাবীজি (সা.)।
নাবীজিকে দেখে আফিয়া কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন,
‘আল্লাহর রাসুল, আমি এখানে আর কতদিন বন্দি থাকব? আমার এই পরীক্ষা কবে শেষ হবে?’
আফিয়ার কথা শুনে নাবীজি (সা.) মৃদু হাসলেন এবং বললেন,
‘আফিয়া, এটা তোমার পরীক্ষা নয়।’
এই উত্তর শুনে বিস্মিত হয়ে পড়েন আফিয়া। তিনি আবার প্রশ্ন করেন,
‘যদি এটা আমার জন্য পরীক্ষা না হয়, তাহলে আমি এখানে কেন? তারা আমার ওপর অসহনীয় জুলুম করছে—আমি আর সহ্য করতে পারছি না…
আফিয়ার এই আর্তনাদ শুনে নাবীজির মুখ মলিন হয়ে যায়। তিনি অশ্রুসজল হয়ে পড়েন। নবিজিকে কাঁদতে দেখে আফিয়াও ভেঙে পড়েন কান্নায়। নিজেকেই দোষারোপ করতে থাকেন—কেন তিনি এমন প্রশ্ন করলেন।
তখন নাবীজি (সা.) বলেন,
‘এটা তোমার নয়; বরং পুরো উম্মাহর জন্য পরীক্ষা।’
একটি উম্মাহ হিসেবে আমরা আমাদের এই বোনকে জালিমদের হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না, আদৌ তাঁকে মুক্ত করতে পারব কি না। তবে এটুকু স্পষ্ট—যারা তাঁর এই পরিণতির জন্য দায়ী, তাদের সঙ্গে কোনো আপস হবে না।
ইনশাআল্লাহ, এই দুনিয়াতেই জালিমদের বিচার হবে। আমরা না পারলেও আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম, তারা না পারলেও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম—একদিন না একদিন আমাদের এই বোনের ওপর চালানো প্রতিটি নির্যাতনের হিসাব গুনে গুনে আদায় করা হবে।

(সংক্ষিপ্ত—বিস্তারিত জানতে কালান্তর থেকে প্রকাশিত আমার লেখা ‘ড. আফিয়া সিদ্দিকি’ বইটি পড়ুন)