নিজের সংসার
মহিলাটাকে প্রায়ই দেখতাম জানালা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে৷ বিকালে আমরা দলবেঁধে কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলতাম। আবার কখনও বুড়িচিঁ খেলতাম। বিষন্ন চোখে মহিলা আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। বয়স ষাট-বাষট্টি হবে। বারান্দায় চেয়ার পাতা থাকতো। কালে-ভাদ্রে সেখানেও বসতেন। বারান্দায় বসেও আমাদের খেলা-ধুলা আর ছোটাছুটি দেখতেন। সুন্দর ফর্সা চেহারা। কিন্তু চোখের নিচে গাঢ় কালি পড়ে গিয়েছিলো। যেন অনেক রাত ভালো করে ঘুমান না। চুল বেশিরভাগই পাকা। স্বামি মারা গিয়েছিলো।। একটাই ছেলে ছিলো ওনার। দূরে বাসা ভাড়া করে থাকতো। ওই একতলা বাড়িতে নাকি ওনার বৌমার পোষাতো না৷ ফ্ল্যাট বাড়ি চাই। অনেকদিন পর পর মহিলাটির ছেলে আর তার বৌ আসতো। কিছুক্ষণ থেকে আবার চলে যেত। মহিলার ছোট্ট নাতনী দেখতে একদম পুতুলের মতো ছিলো।
একদিন মার সাথে আমার এক দরকারে ভদ্রমহিলার ছেলের বাসায় গিয়েছিলাম। ছেলেটি ছিলেন শিক্ষাবোর্ডের অফিসার৷ তিনতলা বাড়ির দোতলায় ভাড়া থাকতেন ওনারা। খুব সুন্দর করে বাসাটা সাজানো ছিলো। নানারকমের খেলনা আর পুতুল ছড়ানো ছিলো৷ ছেলেটির স্ত্রীকে ভালোই মনে হচ্ছিলো। হেসে হেসে মার সাথে অনেক গল্প করলেন। ছয় মাস আগে ওনার ছেলে হয়েছে আরেকটা। শরীর কিছুটা ভেঙে গিয়েছিলো৷ কিন্তু মানসিকভাবে খুব সুখী মনে হচ্ছিলো। মাকে বলছিলেন, ‘’অনেক শান্তিতে আছি ভাবি৷ নিজের সংসার, নিজের স্বাধীনতা। কেউ কিছু বলার নেই৷ বিয়ের পরে নিজের মতো করে থাকা প্রতিটা মেয়ের অধিকার। আমি আমার ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দিয়ে আলাদা করে দেবো৷ থাকুক নিজের মতো করে৷ অন্য একটি মেয়ের সংসারের স্বাধীনতায় আমি হস্তক্ষেপ করবো না৷ আমি তাদের প্রাইভেসি নষ্ট করার কে?’’
তিনি হয়ত কথাচ্ছলে ওনার শাশুড়ির দিকেই ইঙ্গিত করলেন। কারণ, ওনার শাশুড়ি চেয়েছিলেন ওনার একমাত্র ছেলে আর বউ ওনার সাথেই থাক। তাহলে নাতি-নাতনীদেরও কাছে পেতেন।
মা বলেছিলেন, “আপনার শাশুড়িকেই নাহয় আপনাদের কাছে এনে রাখেন। বুড়ো মানুষ, একা একা থাকে।”
ঠোঁট উল্টে মহিলা জবাব দিয়েছিলেন, “ তিনি এখানে এসে থাকতে চান না। নিজের সংসারেই ভালো আছেন। অমিও আর কিছু বলি না। থাক, যার যেখানে শান্তি, সেখানেই থাক। আমাদের সব কিছুই ওনার চোখে বাড়তি খরচ। বাসা ভাড়া নিয়ে আছি, এতেও আপত্তি। এজন্য ভাবি, একা থাকতেই স্বস্তি লাগে আমার।”
মা আর কথা বাড়াননি। শুধু হেসেছিলেন। কথা বাড়িয়ে লাভটা কী? মার পেটে অত বিদ্যা আর যুক্তি-বুদ্ধি নেই যে উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের সাথে কথায় তিনি পারবেন। কথা না বাড়ালেও স্বামির ভিটে বাড়ির মায়া কিন্তু মা বুঝতেন। ঝকঝকে বড় বড় চারটি ঘর আর দুপাশে বারান্দাসহ একতলা ছিমছাম বাড়িটি ফেলে ভাড়া বাসায় এসে থাকতে যে ওনার শাশুড়ির খারাপ লাগে এটা বোঝা খুব কঠিন কিছু তো নয়। তাছাড়া মা ওনার শাশুড়িকে চেনেন ভালোভাবেই। শাশুড়ি হিসেবে ওই মহিলা খারাপ নন যে তিনি থাকলে পুত্রবধূকে জ্বালাতন করবেন৷ খুবই শান্ত স্বভাবের মানুষ৷ কথা বলেন খুব কম৷ কী জানি বাপু! উচ্চশিক্ষিত, আধুনিক মেয়ে বলে কথা, প্রাইভেসি তাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মা আর কথা বাড়াননি।
অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। আজ আমি মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত একজন ডাক্তার। সকালে হসপিটালে ডিউটি করে এসে বিকেলে চেম্বারে বসি। রাত এগারোটা পর্যন্ত রোগী দেখে বাসায় যাই। বৈশাখ মাস পড়েছে। এই সপ্তাহে দুবার বেশ বাতাস হয়েছে৷ আজ ঝোড়ো বাতাসের সাথে বৃষ্টিও পড়ছে অনেক। ৷ রাত আটটার মতো বাজে৷ সিরিয়াল অনুযায়ী রোগী পাচ্ছি না। কেউ কেউ এসেছে, বেশিরভাগই আসেনি৷ রাত সাড়ে আটটার পরে উঠে পড়লাম। বাসায় ফিরবো। আকাশ ভেঙে আসছে যেন। রাস্তার কি অবস্থা কে জানে। গাড়িসমেত ম্যানহোলে না পড়লেই হয়! বের হতে গিয়ে থমকে গেলাম। আনুমানিক পঞ্চাশ-বায়ান্ন বছরের এক ভদ্রমহিলা এসেছেন চেম্বারে৷ পা ফুলে গেছে৷ অসম্ভব ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। কী আর করা? আবারও চেম্বারে গিয়ে বসলাম।
অসুখের বৃত্তান্ত শুনলাম। কেন যেন মহিলাকে চেনা চেনা লাগছে৷ আমার স্মৃতিশক্তি ভালোই। একটু চেষ্টা করতেই মনে পড়ে গেলো। ওই যে ছোটবেলায় মার সাথে শিক্ষাবোর্ডের অফিসারের বাসায় গিয়েছিলাম, ওনারই স্ত্রী। প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বললাম, “‘আপনার সাথে যিনি এসেছেন, ওনাকে ডাকুন৷ আপনার তো এখন টেক কেয়ার করার মানুষ দরকার।”
মহিলা বিষন্ন মুখে বললেন, ‘কে আর আসবে? আমি একাই এসেছি। আপনি যা বলার আমাকেই বলুন৷’
আপনার হাজবেন্ড…
মারা গেছেন দুই বছর আগে।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলিল্লাহি রাজিঊন। মনটা বেশ খারাপ হলো। বললাম, আপনার ছেলে-মেয়েরা?
মেয়েটা জামাইয়ের সাথে বিদেশে থাকে। আর ছেলে… দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহিলা বললেন, ছেলে আমার সাথে থাকে না৷ মেয়ে যখন হলো, আমার বয়স কম ছিলো। তেমন কষ্ট হয়নি, ভালোই ছিলাম। কিন্তু ছেলেকে জন্ম দিতে গিয়ে আমার শরীর ভেঙে গিয়েছিলো, খুব কষ্ট হয়েছিলো৷ কত কষ্ট করেই না ছেলেটাকে মানুষ করলাম আর আজ কি-না সে বউ নিয়ে আলাদা থাকে৷ আমার সাথে থাকলে তার বৌয়ের প্রাইভেসি নাকি নষ্ট হয়। আমি একা একটা মানুষ, এক ঘরে পড়ে থাকি, আমি তাদের প্রাইভেসি কীভাবে নষ্ট করি, বলো তো? ছেলের ওপরে কি শুধু বউয়েরই অধিকার, মায়ের কোনো অধিকার নেই? তাহলে মায়ের পায়ের নিচে আল্লাহ্ জান্নাত দিলেন কেন?
অনেক বছর আগে এই মহিলার হাসি মাখা প্রশান্ত মুখের সাথে আজকের বিষন্ন মুখটা আমি মেলাতে পারলাম না কিছুতেই৷ শুধু মুখটা নয়, কথাও তো মিলছে না! আসলে শরীরের জোর কমে গেলে, মনের জোরও কমে যায়। মনে নানান দূর্বলতা বাসা বাঁধে৷ হয়ত এনার বেলায় তাই হয়েছে। নয়ত নিজেই ছেলের বউকে আলাদা সংসার করে দিতে চাওয়া মানুষ আজ হঠাৎ একসাথে থাকার ইচ্ছে ব্যক্ত করবে কেন?! প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিয়ে বললাম, “যান ওষুধগুলো ঠিকমতো খাবেন আর পায়ে গরম পানির সেঁক দেবেন। একমাস পরে দেখা করবেন।
ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন, ব্যথাটা কমবে তো? আসলে একা একা থাকি, ভয় লাগে…
হেসে বললাম, ‘চিন্তা কী? নিজের সংসারে আছেন। সুখে আছেন নিশ্চয়ই? শত হোক, নিজের সংসার বলে কথা।’
-সমাপ্ত-