প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম
১.
দিনের আলো মিলিয়ে গিয়ে আঁধার নেমেছে। মসজিদ থেকে খানিকটা দূরে বিশাল খেলার মাঠ। বিকেলবেলা শিশু-কিশোর আর তরুণদের হৈ-হুল্লোড়ে জায়গাটা মুখরিত হয়ে থাকে। সন্ধ্যে মেলাতে না মেলাতেই বেশ নীরব হয়ে যায় মাঠটা। দু-চারজন ডায়াবেটিস রোগী কিংবা স্বাস্থ্য সচেতন মানুষকে হাঁটতে দেখা যায় কেবল।
শহর থেকে কিছুটা দূরে বলে মানুষের আনাগোনাও বেশ কম এদিকটায়। বড় আমগাছটির নিচে পাতানো কাঠের বেঞ্চের দু’মাথায় দু’জন ছায়ামূর্তি বসে আছে। কারো চেহারাই পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে না। ঝাঁকড়া চুল কানের লতি স্পর্শ করেছে প্রথম ছায়ামূর্তির। মাথা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে বলে চুল কপাল ছাড়িয়ে চোখ স্পর্শ করেছে তার। গভীর কোনও চিন্তায় যেন মগ্ন সে। আম গাছের সামনে ছোট্ট একটি পুকুর। পুকুরের পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। রুপালি আলোর ছটায় মায়াময় এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে । ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে চারপাশ থেকে। বেঞ্চের অপর পাশে যিনি বসে আছেন, তিনি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন পুকুর থেকে বিকীর্ণ আলোর দিকে। শুধু চেয়েই আছেন, মন যেন তার হারিয়ে গিয়েছে কোন অতল গহ্বরে। সময় গড়াতে লাগল। হঠাৎ খড়মের শব্দে দুই ছায়ামূর্তিরই ধ্যান ভঙ্গ হলো। বেশ শ্লথগতিতে এগিয়ে আসছেন এক বৃদ্ধ। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত বয়স্ক মানুষকে দেখেই কেমন সমীহ জাগে। নড়েচড়ে বসল দ্বিতীয় ছায়ামূর্তি। আগন্তুকও থমকালেন তাদের দিকে তাকিয়ে। প্রথমজনের এদিকে কোনও খেয়াল নেই। একবার তাকিয়েই আবারও সে ডুব দিয়েছে নিজস্ব ভাবনারাজ্যে।
বসবেন কিনা এ নিয়ে যেন দ্বিধায় ভুগছেন আগন্তুক। দ্বিতীয় জন সরে গিয়ে বেঞ্চের মাঝ বরাবর বসলেন। খানিক ইতস্তত করে ফাঁকা জায়গাটাতে বসলেন আগন্তুক। কারো মুখে কোনো কথা নেই। কেউ কারো পরিচিতও নয়। নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছেন তিনজনই। এভাবেই কেটে গেলো আরও খানিকটা সময়। এমন সময়ে মসজিদ থেকে এশার আযান ভেসে এলো। দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে প্রথম ছায়ামূর্তি উঠে দাঁড়াল। দ্বিতীয়জন খেয়াল করলেন, ছেলেটি বয়সে যুবক। কতই বা হবে বয়স? এই ২১, কিংবা ২২? এই বয়সের ছেলেরা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আড্ডা দিতেই বেশি পছন্দ করে। এ এই নির্জন জায়গায় এসে একাকী বসে রয়েছে কেন কে জানে? হয়ত মন খারাপ। এই বয়সে তো কত সম্পর্কেই জড়ায় মানুষ! কে জানে হয়ত মেয়েঘটিত কিছু। গার্লফ্রেন্ডের সাথে ব্রেকাপ-ফ্রেকাপ হবে হয়তো। ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ালেন দ্বিতীয় ছায়ামূর্তি।
বয়স্ক ভদ্রলোক খেয়াল করলেন মধ্যবয়সী লোকটি হাঁটতে হাঁটতে পকেটে বাজতে থাকা ফোনটি কেটে দিলেন।
মৃদুভাবে শ্বাস ফেললেন তিনি। মনে পড়ে গেলো, স্ত্রী বেঁচে থাকতে ঘরে ফেরার বিশেষ তাগাদা অনুভব করতেন। এখন ঘরে ফিরতে দেরি হলে ছেলেরা দুশ্চিন্তা করে না তা নয়। কিন্তু রাহেলার উৎকণ্ঠা ছিলো ভিন্ন প্রকৃতির। আলাদা একটা আবেশ ছিলো তার অপেক্ষায়। আর আজকাল…মানুষ যেন ঘরে ফিরতেই চায় না। যুগ-জামানা সব কেমন পালটে যাচ্ছে! বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পড়লেন ভদ্রলোক। এশার সালাতের জন্য মসজিদের দিকে রওয়ানা করলেন তিনি।
২.
পরদিন একই সময়ে আবারও নির্জন মাঠে উপস্থিত হলেন বৃদ্ধ। স্ত্রীর সাথে মাঝেমাঝে সন্ধ্যের পরে হাঁটতে বেরুতেন ভদ্রলোক। দিনে তেমন বের হতে চাইতেন না রাহেলা। এসব নিয়ে হাসি-ঠাট্টাও কম করেননি। এখন সেসব শুধুই স্মৃতি। ফাঁকা বেঞ্চটার এক কোণায় গিয়ে বসলেন তিনি। আজ রাস্তার ওপরে থাকা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চারপাশটা দেখা যাচ্ছে। গতরাতে আলো জ্বালানো হয়নি কেন কে জানে।
বাইকের শব্দে ঘাড় ফেরালেন বৃদ্ধ। ঝাঁকড়া চুলের এক যুবক এসে থামলো বেঞ্চের কাছে। মোটরসাইকেল পার্ক করে বেঞ্চের অপর কোণায় এসে বসল ছেলেটি। বৃদ্ধ লক্ষ্য করলেন, ছেলেটির কবজিতে উল্কির মতো কী সব আঁকা। বিশেষ কোনো চিহ্ণ মনে হচ্ছে। বার বার বৃদ্ধের মনে হতে লাগলো, ছেলেটিকে যেন কোথায় দেখেছেন! আচমকা মনে পড়লো, আরে! গতকাল সন্ধ্যায় এই ছেলেও তো এখানে বসে ছিল। আযানের পরে সবার আগে এই তো উঠে গেল। আজও এসেছে দেখি।
মিনিট দশেক পরে আরও একজন আবির্ভূত হলেন সেখানে। কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বয়স্ক ভদ্রলোক লক্ষ্য করলেন, গতকাল যিনি তাকে বসার জায়গা করে দিয়েছিলেন, ইনিই তিনি। এ কি কাকতালীয় কোনো ব্যাপার?
আজ তিনি সরে গিয়ে বেঞ্চের মাঝ বরাবর বসার জায়গা করে দিলেন মধ্যবয়সীকে। লোকটির হাতে একটি বক্স। সালাম দিয়ে বসলেন আহন্তুক। মিনিট পাঁচেক বসে থেকে খানিক ইতস্তত করে টিফিন বাটি খুললেন তিনি। চামচে করে কিছুটা খাবার মুখে দিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে একটু হাসলেন তিনি বয়স্ক মানুষটির দিকে তাকিয়ে। বিনিময়ে ভদ্রতাসূচক হাসি ফেরত দিলেন বৃদ্ধ। মনে হচ্ছে, আগন্তুক খুবই ক্ষুধার্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাটি খালি করে ফেললেন।
আঙ্কেল, পানি খাবেন? পাশ থেকে পানির একটি বোতল বাড়িয়ে দিল যুবক।
পানি পান করে বোতল ফিরিয়ে দিলেন মধ্যবয়সী লোকটি। হেসে বললেন, আল্লাহ তোমাকে উত্তম বদলা দিন।
সহসাই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো যুবকের মুখ।
‘বাসা বুঝি কাছেই? রোজ আসা হয় এখানে?’
‘মাঝে মাঝে আসি। ধানমণ্ডিতে আমার বাসা।’
মধ্যবয়সী খেয়াল করলেন, ছেলেটির পোশাক, ঘড়ি, বাইক–সবই অত্যন্ত দামী। বোঝাই যায় যথেষ্ট ধনী পরিবারের সন্তান। ঝাঁকড়া চুল আর গালভরা দাড়িতে ছেলেটিকে কেমন রহস্যময় মনে হয়।
‘পড়ালেখা করো বুঝি? আবারও প্রশ্ন করলেন মধ্যবয়সী।’
‘বিবিএ করছি। আর…আমার নাম তন্ময়।’
‘ও আচ্ছা। আমি মনসুর আহমেদ। মতিঝিলে থাকি।’
‘মতিঝিলে কোথায়? আমার মেজো ছেলে ওখানে থাকে। চাকরি করে। অফিস কাছে হয়, তাই ওখানেই শিফট করেছে.’ এবার বয়স্ক ভদ্রলোকও আলাপে শামিল হলেন।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল মনসুর সাহেবের। ফোনের স্ক্রিনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ভদ্রলোক। কেমন এক অসহায়ত্ব ভর করল তার চেহারায়। রিং শেষ হবার ঠিক আগমুহূর্তে ফোনটা রিসিভ করলেন তিনি।
‘হ্যাঁ বলো। বেরিয়েছি আমি।’
চুপচাপ ওপাশের কথা শুনলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, ‘আমি তোমার খেলনা খুঁজেছি আব্বু। পেলে অবশ্যই নিয়ে আসব। তুমি ঘুমানোর আগেই বাবা চলে আসবে ইন শা আল্লাহ্। ঠিক আছে?’
অপর পাশের কথা শুনে ফোনটা কেটে দিলেন ভদ্রলোক। অসহায়ভাবে একবার এদিক-ওদিক তাকালেন।
‘বাচ্চার আবদার!’ মৃদু হাসলেন বয়স্ক ভদ্রলোক।
'ওরা পথ চেয়ে থাকে কখন বাবা ফিরবে। আমার নাতিগুলোও এমন,’ করুণভাবে একটু হাসলেন মনসুর সাহেব।
‘তো, কী করা হয়?’
‘আপাতত কাজের খোঁজ করছি। বাসায় অবশ্য জানে না। তারা জানে আমি ১০-৬ টা অফিস করছি। আর এ জন্যই বাইরে থাকা।’
‘তার মানে, চাকরি হারিয়েছেন?’ উৎসুক কণ্ঠে জানতে চাইলো তন্ময়।
‘আসলে…চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি।’ চাপাকণ্ঠে জবাব দিলেন মনসুর।
একদৃষ্টে মনসুর আহমেদের দিকে তাকিয়ে রইলো তন্ময়। ভাবতে লাগল, সে একা নয়, সমস্যাগ্রস্ত মানুষ আরও আছে।
‘আমি রমজান আলী। ৩৭ বছর পুলিশে ছিলাম, মানুষ চেনার মতো কঠিন একটি কাজ রপ্ত করেছি। আপাতদৃষ্টিতে নিপাট ভদ্রলোকটিও যে কতবড় ক্রিমিনাল হতে পারে তা আমার থেকে ভালো বুঝি আর কেউ বলতে পারবে না এখানে। আসলে, অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতাই আমাকে মানুষ চিনিয়েছে। তবে…আপনাকে দেখে আমার ভালো মানুষ বলেই মনে হয়েছে,’ বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন।
শুকনোভাবে একটু হাসলেন মনসুর। মাথা নেড়ে বললেন, ‘চাকরি ছাড়ার কথা শুনলেই লোকে প্রথমে ভাবে উল্টোটা। আমি চাকরি ছাড়িনি, বরং আমাকেই চাকরি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। আসলে, তাদের ভুল নয়। এই দুর্মূল্যের বাজারে কে-ই বা চাকরি ছাড়তে ভরসা পায় বলুন? কর্ম জোটানোই তো এখন মুশকিল। রুপালী ব্যাংকে চাকরী করতাম। হ্যান্ডসাম স্যালারি ছিলো, পরিবার নিয়ে সুখেই ছিলাম। বেশিদিন হয়নি চাকরিটা ছেড়েছি।’
‘কিন্তু, চাকরি ছাড়লেন কেন?’ আবারও কৌতূহলী কণ্ঠে প্রশ্ন করলো তন্ময়।
‘আমি আর আল্লাহর অবাধ্য হতে চাই না। এই সুখের জীবন আমাকে চিরস্থায়ী আযাবের দিকে ঠেলে দেবে। চাকরিটা সুদের,’ মাটির দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললেন মনসুর।
“আল্লাহু আকবার!”
আচমকা তন্ময়ের মুখে তাকবীর শুনে কিছুটা অবাক হয়ে তাকালেন মনসুর।
‘আঙ্কেল, এতদিন ভাবতাম আমি বুঝি ত্যাগ করেছি। আজ আপনার গল্প শুনে মনে হচ্ছে, আমারটা কিছুই নয়। আপনি তো আপনার গোছালো জীবন বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেন নি। স্ত্রী-সন্তান, তাদের মুখের হাসি, নিশ্চিত জীবন কিছুই আপনাকে গাফেল করতে পারেনি। আপনার এই ত্যাগ নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে অনেক প্রিয়।’
‘Yes my son, আমি জানি আমার রিজিকের মালিক আল্লাহ্। তিনি নিশ্চয়ই কোনও না কোনও ব্যবস্থা করবেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না। তবে কি জানো, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে আমার দীর্ঘদিন লেগেছে। ইয়ে, তোমার কথা কি যেন বলছিলে?’
মিনিটখানেক চুপ থেকে কথা গুছিয়ে নিলো তন্ময়। তারপর বলতে লাগলো, ‘ছোটবেলা থেকেই গান-বাজনার প্রতি আকর্ষণ ছিল আমার। আমার মা আমাকে সেভাবেই গড়ে তুলেছিলেন। মা চাইতেন আমি নামকরা গায়ক হই। আমাকে গানের স্কুলে দিয়েছিলেন। আমার গায়ক হয়ে ওঠার পেছনে যতটা পরিশ্রম মা করেছেন, ততটা পরিশ্রম আ্যকাডেমিকের জন্যও করেননি। আমি যখন কলেজে পড়ি, তখন ব্যান্ড দলের সাথে যুক্ত হই। দেশে-বিদেশে অনেক কনসার্ট করেছি আমরা। আমাকে নিয়ে, আমার ক্যারিয়ার নিয়ে আমার মায়ের অনেক স্বপ্ন। গতবছর কিছু ভাই আমাকে দাওয়াত দিয়েছেন আল্লাহর দিকে। তাঁদের কথা, তাঁদের আন্তরিকতা, তাঁদের ভালোবাসা আমাকে এতটা বিমুগ্ধ করেছে, যা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। সেই ভাইদের সঙ্গ আমাকে এতটা প্রশান্তি দেয়, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও আমি পাইনি কখনো। গান-বাজনার ব্যাপারে রাসুলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ভয়ানক কথা উচ্চারণ করেছেন, যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এটা জানার পরেও আমি কোন দুঃসাহসে গানের সাথে যুক্ত থাকবো? আমি তো আমার আল্লাহকে ভালোবাসি, আমার রাসুলকে (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালোবাসি। কি করে তাঁদের অবাধ্য হই? এদিকে, আমার পরিবার, বিশেষ করে আমার মা চান আমি এই পথেই এগিয়ে যাই, উন্নতি করি। না পরিবারকে পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারছি না আমি আমার দ্বীনকে ত্যাগ করতে পারব। আমি আর পারছি না এই ভার বহন করতে,’ কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠলো তরুণের।
অপলক নেত্রে যুবকের দিকে তাকিয়ে আছেন বাকি দুজন। অভিভূত হয়ে শিশুরা যেমন রূপকথার সোনার কাঠি আর রুপোর কাঠির গল্প শোনে, ঠিক সেভাবেই তারা শুনছেন তন্ময়ের কথা।
নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলো সে। ‘কুরআন পড়তে জানতাম না। হুজুরের কাছে কুরআন পড়তে শিখেছি। কুরআন-হাদিস পড়তে শুরু করেছি বলে আমার মা, আমার জন্মদাত্রী মা আমাকে বলেছেন, আমার না-কি ব্রেইনওয়াশ করা হয়েছে! নামাজ পড়ি বলে আমি না-কি জঙ্গি দলের সদস্য হয়েছি!’ করুণ এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো তন্ময়ের মুখে, ‘যখন বাসায় বললাম, আমি গান-বাজনা ছেড়ে দেব, তখন মা বিকারগ্রস্তের মতো ব্যবহার করলেন। আমি নাকি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছি। বলেছেন, আমি যদি তার কথা না শুনি, আমাকে তিনি পুলিশে সোপর্দ করবেন। আমার ব্রেইন যারা ওয়াশ করছে, তাদেরকেও ছাড়বেন না। আমার কোনো ভরসা নেই, আমি নাকি যেকোন# মানুষের ক্ষতি করতে পারি!’
কখন যে এক ফোঁটা অশ্রু জমা হয়েছে মনসুর আহমেদের চোখের কোণে তা বুঝতেই পারেননি তিনি। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চিকচিক করছে সেই অশ্রুবিন্দু। আর্দ্রকন্ঠে তিনি বললেন, ‘যুবক, তুমি কি শোনোনি মুসআব ইবনে উমায়েরের কথা? জানো না, দ্বীনের অমিয় সুধা পান করে তিনি কি ছেড়েছিলেন? জানো না, মক্কার সবচাইতে সম্ভ্রান্ত যুবক ছিলেন তিনি? সকালে যে পোশাক পরতেন, বিকেলে সে পোশাক তিনি আর পরতেন না। ওনার সুগন্ধ আসত পারস্য থেকে। মক্কার সবচাইতে সুদর্শন, সবচাইতে ধনী এই যুবক ইসলাম গ্রহণ করার পরে তাঁর মা ওনাকে প্রথমে ইসলাম ত্যাগ করতে বলেছিলেন। পরে বেঁধে রেখেছিলেন, এমনকি খাবার বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরিশেষে এক কাপড়ে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তবুও তিনি আল্লাহর দ্বীনকে ছাড়েননি।’
যুবকের হৃদয়ের বাঁধ যেন ভেঙে পড়ল এ কথায়। ঝরঝর করে কাঁদতে থাকল সে। মাথা নাড়তে নাড়তে সে বললো, ‘যা হবার হবে,আমি আমার রবের অবাধ্য হব না আর। সাহাবীদের তুলনায় আমার পরীক্ষা কত ক্ষুদ্র, কত তুচ্ছ! আমি আমার আল্লাহর সামনে এটা নিয়েই দাঁড়াতে চাই। বলতে চাই, আপনার সন্তুষ্টির জন্য আমি আমার মায়ের হাসিমুখ আর খ্যাতিভরা জীবন বিসর্জন দিয়েছি মালিক। আমাকে গ্রহণ করুন।’
এবার তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন মনসুর। বহুদিনের চেনা মানুষের মতো শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরলো তন্ময়।
কিছু সময় পরে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু লজ্জিত ভঙ্গিতে সরে বসলো তন্ময়। ‘স্যরি, আমি আপনাদের বিব্রত করলাম, কিছু মনে করবেন না যেন।’
‘মনের কথা প্রকাশ করার কিছু জায়গা থাকা ভালো। এতে ভার অনেকটাই লাঘব হয়,’ তন্ময়কে সান্ত্বনা দিলেন রমজান আলী। একটা শ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন, ‘আপনারা কতই না সৌভাগ্যবান, যৌবনকালে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছেন। আল্লাহ্ অনেককেই সুযোগ দেন ফিরে আসার, আবার অনেককেই সেই সুযোগও দেন না। কিছু মানুষের পাপ এতই বেশি যে, আল্লাহ্ তাদের সংশোধনের সুযোগটুকুও দেন না।’
‘মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাওবার পথ খোলা থাকে চাচাজান। ভুল উপলব্ধি করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আপনি এ কথা কেন বলছেন?’ প্রশ্ন করলেন মনসুর। তন্ময়ও তাকিয়ে রয়েছে বৃদ্ধের দিকে।
‘আগে দ্বীনের বুঝ ছিলো না আমার। নামাজের ধার ধারতাম না। কিন্তু, আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আমার স্ত্রী খুব আল্লাহভীরু মানুষ ছিলো। ওর চাপাচাপিতেই নামাজে যেতে হতো মাঝে মাঝে। আমার জন্য খুব দোয়া করত সে আল্লাহর কাছে। আমাকে ঘুষ নিতে নিষেধ করত। দুর্ভাগ্য আমার, তার কোনো কথাই আমি কানে তুলতাম না। অসংখ্য মানুষের সাথে আমি জুলুম করেছি, অন্যায়ভাবে নিরীহ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছি। তখন এসব স্বাভাবিক বলেই মনে হতো। একসাথে যারা চাকরী করতাম, তারাও এমনই ছিলো। বেতন খুব বেশি ছিলো না। মনে হতো, উপরি ইনকাম না থাকলে ছেলেপুলে নিয়ে সমাজে ভালোভাবে চলবো কী করে? বাচ্চাদের মানুষ করবো কী করে? আমার স্ত্রী বোঝাতো, হালালের মধ্যে আল্লাহ্ বরকত দেবেন। সে কষ্ট করে চলতে রাজি আছে। কিন্তু, শয়তানের ফাঁদে পড়ে আমি সেসব কানেই তুলতাম না। আজ ভাবি, আল্লাহ্ আমাকে কতবড় নিয়ামত দিয়েছিলেন। নেককার স্ত্রীর চাইতে উত্তম কিছুই তো এই দুনিয়াতে নেই। পাপিষ্ঠ আমাকে এই নিয়ামত আল্লাহ্ দিয়েছিলেন। কলিগদের কাছে তাদের স্ত্রীদের গল্প শুনতাম। কত আবদার করত। গয়না চাই, শাড়ি চাই, আরও কত কী! আর আমারজন? কোনওদিন দামি কিছু চায়নি। নিজের বা সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া আর কিছু কখনো চায়ইনি। সে শুধু চাইতো আমি নামাজ পড়ি, সৎভাবে চলি। আমাদের চারটা সন্তানকেই সে নামাজী করে গড়ে তুলেছে। এ কৃতিত্ব শুধুই তার। এতবড় নিয়ামত পেয়েও আমি গোনাহ থেকে বাঁচতে পারিনি। আল্লাহ্ কি আমাকে মাফ করবেন?’
রমজান আলীর শেষের কথাগুলো আর্তনাদের মতো শোনালো। নির্বাক শ্রোতা হয়ে বসে রইল বাকি দুজন।
আবার বলতে শুরু করলেন বৃদ্ধ। আল্লাহ্ আমাকে সুযোগ দিয়েছিলেন ঠিকই। নেককার স্ত্রী দিয়ে তিনি আমাকে সৎপথে পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, আমি পারিনি। গোনাহের পাহাড় নিয়ে বসবাস করছি আমি। এখন বয়স হয়েছে। নামাজ, রোজা সবই করছি কিন্তু সেই যৌবনকাল তো আর ফিরে পাব না। এখন অখণ্ড অবসর। ওয়াজ-নসিহত শুনি। এখন ইসলামের জ্ঞান এসেছে। কিন্তু, সেইসব জুলুম তো আর ফেরাতে পারবো না। আর বান্দার হক তো আল্লাহ মাফ করবেন না—আবারো হাহাকার করে উঠলেন রমজান আলী।
‘আপনি হতাশ হবেন না দাদু,’ রমজান আলীকে সান্ত্বনা দিলো তন্ময়, ‘আপনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন এটাও আল্লাহর রহমত। এই যে এখন ইবাদত করছেন, মসজিদে যেতে পারছেন, যিকির করছেন, ইস্তেগফার করছেন, আলেমদের ওয়াজ শুনতে পারছেন এ-ই বা কম কী? অনেকে তাওবা করারও সুযোগ পায় না। আমি কিছু বয়স্ক মানুষকে চিনি যারা মন চাইলেও মসজিদে যেতে পারেন না। অনেকেই চেয়ারে বসে নামাজ পড়েন। আপনি সুস্থ আছেন, ইবাদাতের সুযোগ পাচ্ছেন এটা গ্রিন সিগন্যাল। আল্লাহ্ আপনাকে ক্ষমা করতে চান বলেই সুযোগ দিয়েছেন। শিরক ছাড়া সব পাপই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন।’
ঠিক বলেছে ও—মনসুর সমর্থন করলেন তন্ময়কে। তবে বান্দার হকের বিষয়টা খুবই সেন্সিটিভ চাচাজান। আপনি যাদের হক নষ্ট করেছেন, তাদের মধ্যে চেনা-জানা বা পরিচিত কেউ থাকলে, সম্ভব হলে তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। পেলে মাফ চেয়ে নিয়ে তার পাওনা তাকে ফিরিয়ে দিলেন। পাওনাদারকে না পেলে তার পরিবারকে ফিরিয়ে দিলেও হবে। আর অচেনা মানুষ তো রয়েছেই, যাদেরকে খুঁজে বের করা আদৌ সম্ভব না। তাই, হিসাব করে আনুমানিক একটা পরিমাণ নির্ধারণ করে সাওয়াবের নিয়ত ছাড়াই সেটা দান করে দিয়েন। যারা জুলুমের শিকার হয়েছিলো তাদের নামে এই সাওয়াব লেখা হবে এই নিয়তে। আর, আল্লাহর কাছে অনবরত মাফ চাইতে থাকলে নিশ্চয়ই আল্লাহ মাফ করে দেবেন। আল্লাহ তো গাফুরুর রাহীম।’
মাথা ঝাঁকালেন রমজান আলী, ‘এসবই করছি বহুদিন ধরে।’
‘মা শা আল্লাহ্। আল্লাহ্ সব তাওবাকারীর তাওবা কবুল করুন।’
৩.
যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় কানেক্টেড আছেন এই তিনজন, তবুও সপ্তাহে অন্তত একদিন সেই মাঠের কোণে পেতে রাখা বেঞ্চে একত্রিত হন তারা। অদ্ভুত এক ভালোলাগা কাজ করে তাদের মাঝে। প্রথম দেখায় একে অপরের সম্পর্কে যে ভুল ধারণা করেছিলেন, তা নিয়েও খুব একচোট হাসাহাসি হয়ে গিয়েছে। সাবধানও হয়ে গেছেন অবশ্য। এ জন্যই হাদিসে এসেছে, অধিকাংশ ধারণাই মিথ্যা।
‘কাল বলছিলে ডক্টরের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। কার জন্য?’ ফুঁ দিয়ে বাদামের পাতলা খোসা উড়িয়ে দিয়ে বাদাম মুখে পুরলেন মনসুর সাহেব।
‘আমার জন্য। এই যে ট্যাটু দেখছেন,’ নিজের হাতের কব্জির দিকে ইশারা করলো তন্ময়, ‘এটা রিমুভ করতে শুরু করেছি। তবে, বেশ কিছুদিন সময় লাগবে।’ বাদাম ছিলে মুখে পুরলো সে-ও।
‘সুবহানাল্লাহ! রিমুভ করা যাবে?’
‘ইন শা আল্লাহ। লেজারের সাহায্যে করছে। ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে।’
‘যাক, আলহামদুলিল্লাহ! তোমার বাসার খবর কী বলো তো তন্ময়।’
‘এই তো আঙ্কেল, চলছে। মা’র সাথে তর্ক এড়াতে রোজ দেরি করে বাসায় ফিরি।’
‘এভাবে কতদিন চলবে? মাকেও তো বোঝাতে হবে। দায়িত্ব বেড়ে গেছে না? নিজেও মানতে হবে, অন্যদেরও দাওয়াত দিতে হবে।’
‘তা তো বটেই। কিন্তু মাকে বোঝাতে গেলেই রেগে যান। আমাকে যে পুলিশে দেননি এ-ই ঢের। দোয়া করছি, আল্লাহ্ যেন তাঁর মনকে ইসলামের দিকে ফিরিয়ে দেন। বাবার সাথে কথা হয়। আমার পরিবর্তনে বাবার মধ্যে কোনো আফসোস দেখিনি। কিছু বলেননি। বাবা নিজে ধার্মিক না হলেও ধার্মিক মানুষদের পছন্দ করেন। আমাকে শুধু বলেছেন পড়াশোনা ঠিক রাখতে।’
‘ঠিকই তো বলেছেন। পড়ালেখা করে বড় মানুষ হলে তবেই তো বড় পরিসরে ইসলামের জন্য কাজ করতে পারবে, তাই না?’
‘জ্বি আঙ্কেল। আপনার কাজের কোনো ব্যবস্থা হলো?’
‘টিউশনি করছি দুটো আপাতত। একটা প্রাইভেট কলেজে গণিতের শিক্ষক লাগবে, আ্যপ্লাই করেছি, দেখা যাক কী হয়।’
‘মা শা আল্লাহ্! হবে ইন শা আল্লাহ্। আঙ্কেল, আমাকেও আ্যকাউন্টিং পড়াতে পারেন। বাবাকে বলে ব্যবস্থা করি?’
‘হা হা হা!’
‘আমি কিন্তু সিরিয়াস। আর আঙ্কেল, সাদাফের জন্য একটা গিফট এনেছি। ও অনেকদিন ধরে আপনার কাছে খেলনার আবদার করছে না? আল্লাহ্ আজ মিলিয়ে দিয়েছেন।’ প্যাকেটে মোড়ানো কিছু একটা মনসুর সাহেবের হাতে তুলে দিলো তন্ময়।
‘আরে! এটা কি করেছ? না, না…!’
‘সাদাফকে বলবেন সে এতদিন সবর করেছে বলে আল্লাহ্ খুশি হয়ে এটা তাকে দিয়েছেন।’
বিস্মিত মনসুর দেখলেন, প্যাকেটের ভেতরে একটি ইসলামী ট্যাব টয়!
এটা হাতে পাবার পরে সাদাফের মুখটা কেমন হতে পারে, তা কল্পনা করে আনন্দে চোখে পানি এসে গেলো মনসুরের। এখন মাসের দশ দিন যেতে না না যেতেই হাত একেবারে খালি হয়ে যায়। বর্তমানে বাচ্চার জন্য খেলনা কেনা তার কাছে বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়। মুখে কিছুই বলতে পারলেন না তিনি।
‘পরিবারকে সত্যিটা বলে দিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ, আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলে দিলাম। ভেবেছিলাম সুরমা ঝামেলা করবে। কিন্তু অবাক হলাম, তেমন কিছু বলেনি। ক’দিন বেশ গম্ভীর হয়ে ছিলো। কাল বলছিলো, এ-ই ভালো হয়েছে। সেও শুনেছে সুদের ভয়াবহতার কথা। হারাম পয়সায় বিলাসিতা করার চাইতে হালাল টাকায় কষ্ট করে চলাই ভালো। ওর মুখে এ কথা শোনার পরে কি যে শান্তি পেয়েছি, তা বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই তন্ময়। কে বলে, আল্লাহ্ সহজ করেন না?’
‘আমি বুঝতে পারছি আঙ্কেল। নিশ্চয়ই তিনি সহজ করেন।’
‘আসসালামু আলাইকুম,’ ধীর পদক্ষেপে এসে রমজান আলী এসে বসলেন ওদের পাশে।
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ্। আজ আপনার এত দেরি হলো যে?’ তন্ময় হাসিমুখে প্রশ্ন করলো। ‘আপনার জন্য খবর আছে।’
‘আর আমার দেরির সুযোগে আমার ভাগের বাদামটুকুও সাবড়ে দিয়েছ?’
‘হা হা হা হা…!’
‘হাসো, হাসো। তোমাদেরই সময়। আমি তো এক পা কবরে দিয়েই বসে আছি।’
‘না চাচাজান, আজ আপনারও দিন। আজ আমিও আপনার জন্য একটা অফার নিয়ে এসেছি।’
‘বাহ! আজ দেখি আমার কপাল খুলেছে। তা বলে ফেলো দেখি। নাতি আগে।’
‘দাদু, মুখলেস উদ্দীন ব্যাপারীর ঠিকানা বের করে ফেলেছি,’ মধ্যমা আর তর্জনী দিয়ে তুড়ি বাজালো তন্ময়।
‘বলো কী? এ দেখি অসাধ্য সাধন!’
‘একেই বলে যুবশক্তি। এবার আমি বলি?’ মনসুর সাহেব হাত তুললেন।
‘এই বাচ্চা ছেলের সাথে মিশতে মিশতে তুমিও বাচ্চা হয়ে গেছ। আচ্ছা ঠিক আছে, বলো এবার।’
‘আমার এক স্টুডেন্টের মামাতো বোন। পিতা একেবারেই হতদরিদ্র। বাচ্চাটির পিঠে টিউমার হয়েছে। অপারেশান করতে বড় অঙ্কের খরচ লাগবে বলে চিকিৎসাহীন অবস্থায় কষ্ট পাচ্ছে। কেউ আর্থিকভাবে সাহায্য করলে বাচ্চা মেয়েটির কষ্ট দূর হতো।’
‘তুমি খোঁজ নাও মোট কত টাকা লাগবে। আল্লাহ্ তাওফিক দিলে দেব। বিনিময়ে শুধু ঋণমুক্তি চাই। পরকালে নাজাত চাই।’
‘আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ কবুল করুন।’
ঠিক এই সময় এশার আযান ভেসে এল মসজিদের মাইক থেকে। আজ একইসাথে উঠে দাঁড়ালো তিন প্রজন্মের তিনজন মানুষ। যারা কিনা একই পথের পথিক। কাকতালীয়ভাবে নয়, বরং মহা পরিকল্পনাকারী আল্লাহ্ আযযা ওয়া জাল এই তিনজনের হৃদয়কে একত্রিত করেছেন, যাতে একে অন্যের সঙ্গ পেয়ে নতুনভাবে উজ্জীবিত হতে পারে সিরাত মুস্তাকীমের পথে চলা এই তিন সদস্য।
-সমাপ্ত-