পিশাচ
আমার খাটের নিচে একটা পিশাচ থাকে।
কী? বিশ্বাস হলো না? দাঁড়ান দাঁড়ান। বিশ্বাস টিশ্বাসের গল্প পরে। আগে শুনুন আমাদের সবচেয়ে প্রিয় খাবারের গল্প।
মাংসের হাড়।
মাংস না কিন্তু, শুধুই হাড়৷ আর তাই সবচেয়ে বড় হাড়টা বোধকরি না চাইতেও আমার কপালেই জোটে প্রতিবার। এই যেমন আজকের মতোন। তবে আজকের হাড়টা একটু বেশিই বড়! কোনমতেই বাগে আনতে পারছি না।
দাঁত মুখ খিঁচিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছি, লাভ হচ্ছে না। খাটের উপরে বসে হাড়টার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।
মনে হয় পায়ের হাড়, এত বড়! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরগতিতে ডান হাতটা নিচের দিকে নামালাম। খাটের নিচ বরাবর ডান হাতে ধরা হাড়টা ঝুলিয়ে রেখে কয়েক মূহুর্ত অপেক্ষা করলাম। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না।
কটাশ করে একটা আওয়াজ হল।
হাতটা উঠিয়ে আনতেই দেখলাম মোটা হাড়টার তিন ভাগের দুই ভাগ নাই হয়ে গেছে। এক কামড়ে কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মসৃণ, নিখুঁত কামড়ে!
এখন ছোট হয়ে যাওয়া হাড়টা খেতে সমস্যা হবার কথা না। মুখের কাছ পর্যন্ত আনতেই খেয়াল করলাম আমার ডান হাতের অনামিকা আঙুলটা আর নেই!
“বাল!” হাড়ের সাথে এই আঙুলটাও গেছে! এটা কত নম্বর আঙুল গেল?
দুই হাতের দিকে তাকালাম। চারটা আঙুল আছে দুই হাত মিলিয়ে। ডান হাতে দুটা, বাম হাতে দুটা। ছয়টা আঙুল নাই হয়ে গেছে দশটা থেকে।
হারাধনের দশটি আঙুল, রইলো বাকী চার!
আঙুলের কাটা জায়গার দিকে তাকালাম। একদম সমতল, মসৃন করে কাটা। রক্তের কোন চিহ্ন পর্যন্ত নেই। আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এজন্যই দুই আঙুলে এত বড় হাড় ধরে রাখতে কষ্ট হয়।
-আমার খাটের নিচে পিশাচ থাকে-
সেও হাড্ডি খায়। সাথে আমার আঙুলও খায়। সমস্যা হচ্ছে সে কখনো কথা বলে না। কথা বললে জিজ্ঞেস করতাম, হাড্ডি খাচ্ছে ভাল কথা, আমার আঙুলগুলো ছেড়ে দিলেই তো পারে! ওগুলো খাচ্ছে কেন? আঙুল খেয়ে ফেললে ওকে হাড্ডি খাওয়াবেটা কে?
পিশাচটাকে প্রথম দেখেছিলাম, উমম... ঠিক সাত মাস আগে। খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে মোবাইল টিপছিলাম। হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল। সাথে সাথেই শুরু হলো কেমন এক ঘড়ঘড় আওয়াজ৷ ঠিক আমার পেছনে, খাটের নিচ থেকে।
গরু জবাই দিয়ে ফেলে দিলে কাটা জায়গা থেকে একটা আওয়াজ আসে না? অমন আওয়াজ।
একদম ক্লাসিক হরর গল্পের চরিত্রের মত আমার তখন উচিৎ ছিল 'ও মাগো, বাবাগো' বলে দরজার দিকে উর্ধ্বশ্বাস এক দৌঁড় লাগানো। কিন্তু তা না করে আমি উল্টো ঘুরে মোবাইলের আলো ফেললাম খাটের নিচ বরাবর।
হারামজাদাকে সে রাতেই প্রথম দেখা।
ওর সাথে কখনো কথা না হলেও ওর মাংস প্রীতিটা টের পেয়েছিলাম ক'দিন পরেই। পাশের বাসার এক বিড়াল প্রায়ই খুব জ্বালাতন করত আমার ঘরে এসে। আমি আবার এসব পোষা প্রাণীটানি একদম দেখতে পারি না। তাই ভারী বিরক্ত হতাম। তবে অত্যন্ত শান্ত মানুষ তো, কিছু বলতাম না কখনো। একদিন কী হলো জানেন, হুট করে বিড়ালটা নাই হয়ে গেল! নাই মানে নাই! কত দিকে কত খোঁজাখুঁজি! কোন খবরই হলো না৷
বিড়ালের মালিক মেয়েটা তো কেঁদেকেটে হয়রান।
আমি অবশ্য মনে মনে খুশিই হয়েছিলাম। আপদটা বিদেয় হয়েছে! তবে ভুল ভাঙলো সেদিন রাতে। সাধারণত আমি খাটে উঠে বসলেই নিচ থেকে ঘড়ঘড় আওয়াজ আসতে থাকে। সেদিন খাটে ওঠার পরেও অনেকক্ষণ কোন খাটের সাড়াশব্দ না পেয়ে শেষে নিজেই উঁকি দিলাম।
ওমা! দেখি সেই বিড়ালের ছেঁড়া মাথাটা মুখে গুঁজে উবু হয়ে শুয়ে আছে সে!
বাকি অংশ কোথাও না দেখে বুঝলাম, গেছে! গিলে ফেলেছে পুরোটাই! আমি তাকিয়ে দেখতে দেখতেই মাথাটা কটরমটর করে ভেঙে কুড়মুড় করে কামড়ে টুপ করে গিলে নিল!
রক্তের এক বিন্দু ফোটাও রইলো না কোথাও। ফকফকা ঝকঝকা মেঝে।
-আমার খাটের নিচে পিশাচ থা...-
সেদিনই বুঝলাম এই শালার মাংসের হাড় খুব পছন্দ। সেদিন থেকে নিজে খাওয়ার পাশাপাশি ওকেও খাওয়াই। এখন প্রশ্ন করতেই পারেন, খাটের নিচে এমন ভয়ংকর কোন কিছু ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে, আমি কাউকে কিছু বলি না কেন? নিজেও ভয়ে ঘর ছেড়ে পালাই না কেন?
প্রশ্ন করাটাই স্বাভাবিক। তবে উত্তরটা আরো সহজ। আমার একটা সমস্যা হলো, সহজ কথা হুটহাট ভুলে যাই! এই যেমন ওই প্রশ্নের উত্তরটা এখন ভুলে গেছি! উত্তরটা মনে আসলেই জানিয়ে দিব আপনাদের।
সেদিন কী হল তা শোনেন। এই তো কিছুদিন আগের এক সকালে। আমার বড় চাচা। যার বাড়িতে থাকি আমি। ওনার সে কী হম্বিতম্বি! সে কী ভয়ানক রাগ, গর্জন করে যেন বাড়ির ছাঁদ নামিয়ে ফেলতে চাইছেন নিচে!
সব রাগ আমার উপর। এটা ঠিক রাগ নয়৷ ঘৃণা। ভয়ংকর নিকৃষ্ট ঘৃণা৷ সবার সামনে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করলেন আমাকে। সবসময়ই করেন। সেদিন করলেন হিসেব ছাড়া।
তার এই বাড়িতে বসে থেকে তার অন্ন ধ্বংস করছি। বাবা মারা যাবার পর তার দয়ায় দুটো খেয়ে পরে বেঁচে আছি। আর এই আমি কী না নজর দেই তার একমাত্র মেয়ে রুমকির উপর?
এই মিথ্যা কথাটা তাকে কে বলেছে আমি জানিনা। তবে ভীষন কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিনের সেই অপবাদে। বাড়ি ছেড়ে চলে যাব ভাবছিলাম সে রাতেই। কিন্তু ঘটলো আরেক ঘটনা।
সেদিন বিকেলে দোকানের উদ্দেশ্যে বের হওয়া বড় চাচা আর বাড়ি ফিরলেন না।
বেমালুম উধাও হয়ে গেলেন! পুরো তল্লাটে খুঁজেও তার কোন হদিস মিললো না, কোন যোগাযোগ করা গেলো না তার সাথে। পুলিশটুলিশ কেউই তার টিকিটির খোঁজ পর্যন্ত বের করতে পারলো না।
মনটা খারাপ করে নিজের ঘরের বিছানায় শুয়ে ছিলাম। রাত হবে তখন একটা কি দুটো। হঠাৎ শুনলাম খাটের নিচ থেকে সেই কটমট শব্দ। সারাদিন ওর কথা মনে ছিলো না! মনে পড়তেই ঝট করে খাটের নিচে উঁকি দিতেই দেখি,
বড় চাচার মাথাটা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে!
হাঁ করা মুখ থেকে আধহাত জিহ্বা বেরিয়ে এসে ঝুলে আছে মেঝে অব্দি। দু'চোখের মনি ফুলে ফেঁপে আছে যেন দুটো ফোটকা বেলুনের মত টাস করে ফুটে যাবে এখুনি! এটা কোন কথা? অমন বাজখাঁই গমগমে গলায় কথা বলা চাচার মাথা ওমন ফোটকার মত ফুলে থাকবে কেন?
তাও যদি চাচার মাথার নিচ থেকে পুরো শরীরটা থাকতো তাহলে বোধকরি অস্বস্তিটা কম লাগতো। সমস্যা হচ্ছে বাকি শরীরটার কোন অস্তিত্বই নেই শুধু ছেঁড়া মাথাটা ছাড়া। গলার নিচ থেকে মাংস, হাড় সব টেনে টেনে ছিঁড়ে কচমচ করে চিবিয়ে গিলেছে সে। কোথাও কেন রক্তের দাগ পর্যন্ত নেই।
চাচার হাঁ করা মুখটা যেন কিছু বলতে চাইল আমাকে। অস্ফুটে কিছু শব্দ কানে এলো। শোনার সময় পেলাম না৷ পিরানহার মতো নিজের শরীরের চেয়েও বিকট এক হাঁ করে মাথার খুলি বরাবর সপাটে দুই চোয়াল নামিয়ে আনলো পিশাচটা। কটাশ করে আওয়াজ হল। আমি আর দেখলাম না৷ ওমন জাদরেল মানুষের মাথা নারকেলের মত কটাশ করে ফেটে যাচ্ছে এ দৃশ্য দেখাও পাপ।
-আমার নিচে পিশাচ থাকে-
তারপর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন৷ ওর সাথে আমার খাতির ভীষণ৷ ইদানীং টুকটাক কথা বলা শিখছে। সেদিন হাড্ডির থেকে নরম মাংস ছিঁড়ে ওর সামনে ধরতেই চেচিয়ে উঠল, “ফা.....................”
বুঝলাম মাংসে এখনো তার রুচি হয়নি৷
হবে হবে। হাড় খেতে খেতে একদিন মাংসেও রুচি হবে। আজকে আমার মনটা ভীষণ ভালো। রুমকি আসবে দেখা করতে।
রুমকি কে বলেছিলাম? ভুলে গেছি। ও আমার সেই বড় চাচার মেয়ে। চাচা উধাও হয়ে যাবার পর থেকে ওর সাথে খাতিরের পারদটা উপরে নেয়ার চেষ্টা করছি।
রাত চারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। রুমকি আসলো না৷
পরদিন সারাদিন দেখা করলো না৷
সেদিন রাতেও আসলো না৷
তার পরদিনও রুমকি দেখা করলো না৷
সে রাতে ভীষণ মন খারাপ হলো। আমার বিষন্নতা পিশাচটা বুঝতে পারে। শুনলাম সে খাটের নিচ থেকে গান গাইছে।
“অ্যাকা পিশাচ বসে আছে শহুরে দেয়ালে
শীষ দিয়ে গান গায় খটখটে খেয়ালে...”
গানটা ভালো। তাও মন বসলো না৷ রুমকিকে দেখতে ইচ্ছে করছে। কানে এলো খটরমটর শব্দ। খাটের নিচ থেকেই অবশ্যই। ঝট করে নিচে চাইতেই মনটা জুড়িয়ে গেল!
ওই তো রুমকি।
চেয়ে আছে সোজ আমার দিকে। ড্যাবড্যাবে খোলা চোখে চেয়ে আমার দিকে। খোলা চুলগুলো ছড়িয়ে আছে চেহারার উপর৷ কী অপূর্ব সুন্দর লাগছে। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম খাটের নিচে রুমকির মাথার দিকে। মাঝেসাঝে রুমকির গলার নিচ থেকে খটরমটর করে হাড় খাওয়ার শব্দ ভেসে আসলেও আমার বিমুগ্ধ নয়ন তার থেকে ফেরাতে পারলো না৷
-আমার পিশাচ থাকে-
__________________________________________________
২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
মিরপুর ১২, পল্লবী রোড ১৮ এর বাসা নং ৪৭,
দরজার বাইরে গিজগিজ করছে মানুষ। শতশত মানুষ। বাসার দরজা খোলা। ভেতরে ঢোকা বারণ। মিডিয়া থেকে পুলিশে জনাকীর্ণ হয়ে আছে পুরো বাসার বাহির ভেতর৷ থানার ইনচার্জ মোরশেদ সাহেব গম্ভীর হয়ে মুখে একটা রুমাল চেপে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চেহারায় রাজ্যর সব মেঘ জমে আছে। পাশের বিল্ডিংয়ে থেকেও বিন্দুমাত্র টের পেলেন না এত বিশাল কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে রেখেছে কেউ এই বাসায়৷
এই বাসার মানুষ সংখ্যা এক। একটা চব্বিশ বছর বয়সের তরুন। নাম রাফি।
রাফির বাবা মা মারা গেছে বহু আগেই। ছেলেটা থাকতো তার বড় চাচার সাথে৷ রাফির বড় চাচা আসলাম শিকদার ছিলেন এক জাঁদরেল অ্যাডভোকেট। যার নামেই মোটামুটি অর্ধেকের বেশি কেস সলভ হয়ে রায় তার পক্ষে চলে আসতো।
এই আসলাম শিকদার, তার স্ত্রী, আর এক মেয়ে নিয়ে ছিল সংসার। তাদের সাথে থাকতো ভাতিজা রাফি। সাত মাস আগে আসলামের পুরো পরিবারের সবাই নিঁখোজ হয়ে যায়। রাফি বাদে। চাঞ্চল্যকর এডভোকেট আসলাম অন্তর্ধান কেস নিয়ে পুলিশ রিতীমত মাথা কুটে মরেছে এ কয়দিন। কিন্তু কারো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সম্ভবত আজ পাওয়া গেছে।
রাফির খাটের নিচে বিশাল এক গর্ত। সেই গর্তের উপর কাপর দিয়ে ঢাকা। প্রথম দেখায় বোঝাও যাবে না ফ্লোরের ভেতর এত বড় গর্ত থাকতে পারে!
সেই গর্ত থেকে একে একে উদ্ধার করা হয়েছে ১৮ টা মানুষের মাথার খুলি, হাড়-গোড়।
গত সাত মাসে এই এলাকা থেকে নিখোঁজ ২২ জনের মাঝে ১৮ জনই যে এখানেই আছে তাতে কারো আর কোন সন্দেহ নাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে পুলিশের নাকের ডগায় বসে থেকে রাফির মত একটা ছেলে ১৮ জন মানুষকে মেরে জবাই করে মাথা খাটের নিচে রেখে দিল আর কেউ টের পর্যন্ত পেলো না?
ওসি মোরশেদ সাহেবও বিরস বদনে মিডিয়ার ছোড়া একের পর এক প্রশ্ন বানে বিদ্ধ হচ্ছেন। কিছু করার নেই তার হজম করা ছাড়া।
রাফি ছেলেটাকে দেখলে মনে হবে গত সাত মাস ধরেই সে কিচ্ছু খায়নি৷ জীর্ণ শীর্ণ শুকনো শরীর। চেহারা দেখে মনেই হয় না সে কোন সেন্সে আছে! মাতাল উদভ্রান্তের মত হাবভাব।
রাফির ডান হাতের তিনটা এবং বাম হাতের তিনটা, মোটা ছয়টা আঙুলই কাটা। দুটো করে মাত্র চারটে আঙুল আছে টিকে আছে এখনো।
রাফির কাছ থেকে পাওয়া গেলো একটা পুরোনো আমলের টেপরেকর্ডার। যাতে প্লে বাটনে ক্লিক করলেই কেউ একজন একটা গল্প বলা শুরু করছে, রেকর্ড করা সে কথাগুলোর প্রথম বাক্যটা হচ্ছে,
“আমার খাটের নিচে একটা পিশাচ থাকে!”
_________________________________________________
রাত বারোটা,
মোরশেদ সাহেব গম্ভীর মুখে নিজ ঘরের খাটের উপর বসে আছেন। সারাদিন ধকলের পর ধকল গেছে তার উপর দিয়ে। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলেন। তারপর ড্রয়ার খুলে একটা ছবি বের করলেন।
অপূর্ব সুন্দরী এক তরুণী। হাস্যোজ্বল চোখে যেন তাকিয়ে আছে সোজা মোরশেদ সাহেবের দিকে। ফ্রেমের নিচে একটা সাক্ষর। মেয়েটার নিজের হাতে করা সাক্ষর।
মোরশেদ সাহেব দু'চোখ বন্ধ করলেন। কয়েকটা দৃশ্য মুহূর্তের মাঝে খেলে গেল তার বন্ধ দুই চোখে।
অনার কিলিং!
অনার কিলিং মাই ফুট!
একজন জন্মদাতা বাবা... কীভাবে পারে নিজের মেয়েকে কাউকে দিয়ে ধ র্ষ ন করিয়ে মার্ডার করাতে? এইটাতো শুধুমাত্র বিভৎস কোন দুঃস্বপ্নে দেখা সম্ভব!
মোরশেদ চোখের পাতা দুটো আরো জোরে চেপে ধরলেন। সাত মাস আগের সেই ঘটনা ভাসছে চোখে তার!
ভার্সিটি থেকে যাওয়া শিক্ষা সফরে নিখোঁজ হলো এক ঝলমলে উচ্ছল তরুণী আর মেধাবী এক হিন্দু তরুন। সন্দেহের তালিকায় নাম উঠলো সেই সফরে যাওয়া প্রায় বিশ জন ছেলের। যাদের মাঝে একটা ছেলের সাথে মেয়েটার রয়েছে আত্মীয়ের সম্পর্ক।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর মেয়েটার ব্রুটালি রেইপড এন্ড মার্ডারড এবং সাথে সেই হিন্দু ছেলেটারও নৃশংস ভাবে খুন হওয়া লাশ উদ্ধার হলো। প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার হলো মেয়েটার আত্মীয় সেই ছেলেটা সহ বাকী বিশজনই।
কিন্তু সেই ছেলের প্রবল প্রতাপশালী আর ক্ষমতাশীলদের পদলেহনকারী এডভোকেট বড় চাচা কী করলো? নিজের ভাতিজাসহ পুরো সন্দেহভাজন সবাইকে বেকসুর খালাস করিয়ে বের করে আনলো কোর্ট থেকে!
মোরশেদ সাহেব হাত থেকে ছবির ফ্রেমটা নামালেন।
ছবির নিচে মেয়েটার নামটা জ্বলজ্বল করছে, রুমকি।
রুমকি, যার বাবা এডভোকেট আসলাম শিকদার। চাচাতো ভাই, রাফি।
রুমকি, যে মেয়েটাকে নিজের আপন মেয়ের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন মোরশেদ সাহেব।
রুমকি, যাকে শুধু মাত্র অন্য ধর্মের ছেলের সাথে প্রেমের অপরাধে রাফিকে দিয়ে নৃশংসভাবে খুন করিয়ে নিজ পরিবারের মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন আসলাম শিকদার!
হাহ!
অনার?
জীবনের চেয়ে বড় ধর্ম! জাত! সম্মান!
থুহ!
মোরশেদ সাহেব ঘুমোবেন৷ কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে খাটের নিচ থেকে কোন আওয়াজ পাচ্ছেন না। ভাল লাগছে না তার৷ টেবিলের উপরের মাংসের বাটি থেকে একটা হাড় নিয়ে খাটের সামনে ধরতে কটাশ করে এক কামড় দিয়ে হাড়টা কেটে নিয়ে গেল কেউ।
মোরশেদ সাহেবের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো।
লম্বা হয়ে খাটে শুয়ে পড়লেন তিনি৷
শূন্য সেই খাটের নিচ থেকে কাল্পনিক এক কুড়মুড় আওয়াজ শুনে অপার্থিব এক শান্তি পেলেন মোরশেদ!
যেই শান্তি তিনি পেয়েছিলেন আসলাম, আসলামের বৌ সহ বাকী ২০টা ছেলেকে খুন করে, রাফি ছেলেটাকে ক্রমাগত ড্রাগড করে নরক যন্ত্রণা ভোগ করিয়ে শেষ সাতটা মাস।
ঘুম পাচ্ছে মোরশেদ সাহেবের। একটা তৃপ্তির হাসি হাসলেন তিনি। বিড়বিড় করলেন...
-পিশাচের উপরেও এক পিশাচ থাকে-
(সমাপ্ত)