জীবন্ত
”লাশগুলো কার ছিল বলেন তো মাসুদ?”
খাটিয়ায় শোয়ানো কাফনের কাপরে মোড়ানো শরীরটা হঠাৎ ছটফটিয়ে উঠলো! চমকে উঠলো মাসুদ। কাঁধে ধরে রাখা খাটিয়ার সামনে ডানদিকের হাতলটা কাঁধ থেকে ছেড়ে দিল তৎক্ষনাৎ। প্রায় লাফিয়ে সরে গেল একপাশে। মাসুদ হঠাৎ হাত ছেড়ে দেয়ায় খাটিয়া ধরে রাখা বাকীরাও ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। ডানদিকে কাত হয়ে গেল খাটিয়াটা। আরেকটু হলেই পড়ে যায় যায় এমন সময় একজন মুরুব্বি এসে ডানদিকের হাতলটা শক্ত করে ধরে ফেললেন। সবাই জোরে জোরে জিকির করছে। এই ব্যাপার নিয়ে তেমন মাথা ঘামালো না কেউ। খাটিয়া নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এমন হোঁচট খাওয়া কীংবা হাত অবশ হয়ে যাওয়া প্রায়ই এমনটা ঘটে।
কিন্তু মাসুদ স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে তার হাত কেন ছুটে গেছে!
প্রথমে তার মাথার ভেতর কে যেন কথা বলে উঠেছে! একদম মাথার গভীরে কোথাও!
আর প্রায় সাথে সাথেই ওই খাটিয়া শোয়ানো শরীরটা নড়ে উঠেছে!
সেটা কী আর কেউ টের পায়নি? নিথর ওই শরীরটা কী তবে... জ্যান্ত? আর... কথা বললো কে?
হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে বাকীদের যাওয়া দেখতে লাগলো মাসুদ। ওর কী কোথাও ভুল হলো? শোয়ানো লাশটা যদি ওভাবে ছটফট করেই ওঠে তবে তো ওপাশে থাকা বাকীদেরও অবশ্যই টের পাবার কথা! কিন্তু কই! কারো মাঝে তো কোন ভাবান্তর নেই। সবাই জোরকদমে জিকির পড়তে পড়তে হেঁটে চলেছে কবরস্থানের দিকে!
আচ্ছা যদি এমন হয়, খাটিয়ার ওই দেহটা জীবিত! সে মরেইনি! এমন তো কত ঘটনাই তো আছে। কবর দেয়ার পরেও দেখা গেছে যে বেঁচে আছে। ওমন কিছু হতে পারে? অবশ্যই পারে। কাউকে ডেকে বলবে কী না ভাবতে গিয়েও থেমে গেলো।
কারণ তার মনেই ছিল না, আর যাই হোক, অন্ততঃ এই লাশের পক্ষে বেঁচে ওঠা সম্ভব না।
লাশের শরীরের ডান কাঁধ থেকে বাম পাশে কোমর পর্যন্ত কোণাকুণি ভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছে। বুকের ভেতরের হৃৎপিন্ড, কলিজা নাড়ীভুঁড়ি যা আছে সবই রাস্তায় পড়ে ছিলো। গাড়ির চাকায় পিষে পিচের সাথে মিশে গেছে। মর্গের ডোম তার মোটা সুঁই-সুতো দিয়ে কোনমতে সেলাই করে লাশটাকে কবরস্থ করার যোগ্য করেছে।
এই লাশ আবার নড়ে কীভাবে? কেউ তার মাথার ভেতর কথাই বা বলে কীভাবে?
আর লাশগুলো কার মানে? খাটিয়ায় তো একটাই লাশ! একটাই লাশ! তবে?
অবশ্যই মাসুদের ভুল হয়েছে। ক্লান্তি? টেনশন? কষ্ট? সব মিলিয়ে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে তার? ভুলভাল শুনছে? দেখছে?
পেছন থেকে হঠাৎ কেউ একজন তার কাঁধে হাত রাখলো। চেপে ধরল শক্ত হাতে। চমকে উঠলো মাসুদ। ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠে পেছনে ফিরতেই দেখলো সাদা দাঁড়িতে মুখ ঢাকা এক বয়োবৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে আছেন। ব্যাথায় বিকৃত চোখমুখ নিয়েই শুনলো লোকটা বলছে,
“সবাই-ই একদিন দুনিয়া ছাইড়া বিদায় নিবে। ভাইঙা পড়লে চলবে না বাবা। আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। উনি যেন কপালে বেহেশত নসীব করেন। কবরের আজাব বড় ভয়ংকর। বড় ভয়ংকর ওই শাস্তি। ওই ভয়ংকর আজাব থেকে যেন এই আত্মা রক্ষা পায় সে দোয়া করতে হবে।”
মাসুদ একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। বৃদ্ধ লোকটা ভুল করছে। ওই খাটিয়ায় শোয়ানো লাশটা তার পরিচিত কেউ নয়। উনি সম্ভবত ওই লোকটাকে মাসুদের আত্মীয় কিংবা পরিচিত কেউ ভেবে গুলিয়ে ফেলেছেন। লোকটার ভুল ভাঙানোর জন্য মুখ খোলার আগেই লোকটা দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেল সামনের দিকে। কিছু বলার কোন সুযোগ পেল না মাসুদ। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল সামনের দিকে।
সমস্যা হলো তার নিজের ও মনে পড়ছে না লাশটা কার!
সেই বা কেন এই জানাজায়?
তার তো এখানে থাকার কথা ছিলো না।
তবে?
কিছুই পরিষ্কার করে মনে পড়ছে না মাসুদের।
এলোমেলো পায়ে বাকীদের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে কবরস্থানে এসে উপস্থিত হলো। খাটটা নামিয়ে রাখা হয়েছে সদ্য খোঁড়া এক গভীর কবরের পাশে। কবরস্থানটা সমতল থেকে বেশ খানিকটা উঁচু জায়গায়।
কবরস্থানে এখন সব মিলিয়ে জনা দশ পনেরো জন মানুষ হবে হয়তো। সবার পরণে সাদা পাঞ্জাবি। পশ্চিম দিকে মুখ করে তারা দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর খাটিয়ার দিকে নজর দিলো। ওদের নজর অনুসরণ করে মাসুদও খাটিয়ার দিকে তাকালো।
অবাক হয়ে দেখলো খাটিয়ার উপর শুধু সাদা কাফনের কাপরটাই পড়ে আছে! ভেতরে কোন লাশ নেই!
“মুর্দা কই গেল!” বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল মাসুদ। তাহলে সে ঠিকই শুনেছিল! লাশটা আদতেই জীবিত ছিল? খাট থেকে নেমে গেছে সবার অলক্ষ্যে? কেউ টেরও পেলো না? এটা কেমন কথা!
তার চেয়ে বেশি অবাক লাগছে লোকগুলোকে খালি কাফনের কাপর দেখে একবিন্দুও হয়রাণ মনে হচ্ছে না। যেন এটাই হবার ছিল এমন একটা শান্ত ভাব সবার মাঝে! সামনে থাকা মানুষগুলো কাফনের কাপরটা তুলে নিল খাট থেকে। তারপর সবাই একই সাথে ঘুরে তাকালো মাসুদের দিকে।
সদ্য খোঁড়া গভীর এক কবর ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো মুর্দার খোঁজ না নিয়ে তাকিয়ে আছে সোজা মাসুদের দিকে! তাদের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না মাসুদ। কী শীতল! কী তীক্ষ্ণ সে দৃষ্টি!
“আমার দিকে তাকিয়ে কেন ওরা!” বিড়বিড় করলো মাসুদ। “আমার দিকে তাকিয়ে কেন! ওই খাটিয়ার মুর্দা নাই হয়ে গেছে! সে নিয়ে ওদের কোন বিকার নাই! আমার দিকে তাকিয়ে কেন সবাই?”
উত্তর খোঁজার সময় পেলো না বেশিক্ষণ। সবাই ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগলো মাসুদের দিকে। কয়েক পা পেছনে সরে গেল মাসুদ। আর থাকা সম্ভব না। তার নার্ভ এই চাপ নিতে পারছে না। পেছনে ঘুরতেই থমকে যেতে হলো।
মাসুদকে ইতোমধ্যে গোল হয়ে ঘিরে ফেলেছে মানুষগুলো। ওর পেছনে কখন এলো ওরা? টের পর্যন্ত পেলো না! মাসুদ জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করল ওরা আসলে কী চায়। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ আসলো না। বরং একটা তীক্ষ্ণ গলার আওয়াজ ভেসে এলো যেন বহু দূর থেকে,
“ওই খাটিয়ায় কার লাশ?”
“ওই খাটিয়ায় কাদের লাশ?”
“ওই খাটিয়ায় কীসের লাশ?”
পরপর তিনটা প্রশ্ন তার মস্তিষ্কের ভেতরে গিয়ে ধাক্কা দিল যেন। আসলেই তো! কার লাশ ছিল ওটা?
কার জানাজা হচ্ছিলো? কার লাশের খাটিয়া নিয়ে যাচ্ছিল মাসুদ?
সে জানেই না!
কোনমতেই মনে করতে পারলো না কার লাশ ওটা! কাকে কবর দেয়া হচ্ছিল? কাকে?
কবর?
এবার চোখ গেল খুঁড়ে রাখা কবরটার দিকে! কিন্তু কোথায় কবর? একটু আগেও দেখা গভীর সে কবরের জায়গায় এখন কিছুই নেই। সমতল মাটি। যেন কখনো কোন গর্তই করা হয়নি এই মাটিতে।
“কবরটাই বা কই গেল!”
মানুষগুলো এখন ওকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। গোল গোল হয়ে চক্কর কাটছে। যেভাবে কবরটাকে ঘিরে খাচ্ছিলো একটু আগে।
প্রতিটা চক্করে ওর দিকে অল্প অল্প করে এগিয়ে আসছে ওরা। একদম কাছে, নিঃশ্বাস সমান দূরত্বে এসে দাঁড়িয়েছে মানুষগুলো। মাসুদ আর কিছু ভাবতে পারলো না। কার লাশ, এই মানুষগুলো কারা, কে কথা বলছিল, কবর কই গেল, সে এখানে কেন কিছুই আর ভাবার সুযোগও হলো না।
তার সারা শরীরে কিলবিল করতে লাগলো অসংখ্য হাতের শত শত আঙুল!
জীবন্ত সেই হাতগুলো সাপের মত প্যাঁচিয়ে ধরলো মাসুদের নাজুক ভঙ্গুর মানব শরীরটাকে। সবগুলো আঙুল গিয়ে চেপে ধরলো মাসুদের বুকের দু-পাশটা। সমান্তরালভাবে অজস্র আঙুল তার বুকের ডান পাশ আর বাম পাশে চাপ দিতে লাগলো। অসহ্য সেই চাপ! অসংখ্য আঙুলের সাঁড়াশির মত চাপ তার বুকের হাড় গুলোর উপর দেবে বসতে লাগলো! একটার পর একটা হাড় ভাঙার মটমট আওয়াজ কানে এসে বিঁধতে লাগলো মাসুদের।
নিষ্প্রাণ কলের পুতুলের মত অনুভব করলো তার চামড়া, মাংস, ধমনী সব ছিঁড়ে বুকের ছাকনার পাঁজরের হাড়গুলো সব মাঝখান থেকে ভেঙে গলার নিচ থেকে তলপেট অব্দি সমান্তরালে দু'পাশে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। ঠিক একটা খোলা বইয়ের মতো দুই ভাগ করে চামড়া দু-পাশে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে বুকটাকে!
তখনো... জ্যান্ত মাসুদ!
মাটিতে পড়ে থেকে তার সেই জ্যান্ত দু'চোখে দেখতে লাগলো, তার বুক থেকে পেট অব্দি ছিঁড়ে বিশাল গর্ত করে ফেলা মানুষগুলো এখনো তার শরীরের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে!
এখন তাদের প্রত্যেকের শরীরে সাদা কাফনের কাপর প্যাঁচানো। প্রত্যেকের মুখ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সাদা কাপরে ঢাকা। কারো গমগমে গলা ভেসে এলো,
“তোমাদের কবর কোথায়?”
সাদা কাপড়ে মোড়ানো মানুষগুলো সবাই মাথা ঝুঁকিয়ে তাকিয়ে আছে মাসুদের খুলে রাখা বুকের দিকে। তারপর একজন একজন করে সেই খোলা বুকের ভেতর নামতে শুরু করলো!
বিশাল বিশাল মানুষগুলো অবলীলায় নেমে গেল মাসুদের ছিড়েখুঁড়ে আলাদা করে রাখা সেই বুকের গভীরে! একের পর এক, একের পর এক, একে একে সবাই!
সবাই যেন নেমে গেল তাদের জন্য খোঁড়া এই মানব কবরে।
“কবরে মাটি দেয়া যাক তবে!” মাসুদ আবছা চোখে দেখলো সেই শুভ্র দাঁড়িওয়ালা মুরুব্বিকে।
কবরে মুর্দা নামানোর পর যেভাবে মুঠো মুঠো মাটি দেয়া হয়, সেভাবে মুঠ করে করে মাসুদের ছেঁড়া চামড়া, মাংস, জমাট রক্ত, হাড়ের টুকরো ছুঁড়ে ফেলে তার বুকের গহীন কবরটাকে ধীরে ধীরে ভরে ফেলা হলো।
মাসুদ আর কিছুই অনুভব করছে না এখন। তার শরীরটা ধীরে ধীরে একটা সত্যিকারের ঘাস লতাপাতায় ভরে যাওয়া পুরনো কবরে রূপান্তরিত হতে থাকার অপেক্ষায় রইল সে... অপলক।
_______________________________________________________
“মাসুদ চৌধুরী? ওই সি.আই.পি মাসুদ চৌধুরী? দেশের শীর্ষ শিল্পপতিদের মাঝে একদম উপরের দিকে যার নাম ছিল?”
“হু! এইটা সেই মাসুদ চৌধুরীই!”
বোকার মত মুখ করে সামনে পড়ে থাকা এক ছিন্নভিন্ন লাশের দিকে তাকিয়ে আছে দুই সংবাদ কর্মী। লাশটার বুক থেকে পেট অব্দি সব বাইরে এসে পড়ে থাকলেও তার চেহারাটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে!
“মাসুদ চৌধুরী মানে.... চৌদ্দ বছর আগের এখানে থাকা সেই ‘মাসুদ প্লাজা'?”
মাসুদ প্লাজা, চারতলা গার্মেন্টস কাম শপিং মলটা নির্মানত্রুটির জন্য ১৩ বছর আগে যেদিন ধ্বসে পড়েছিল ভেতরে থাকা প্রায় ১২০০ মানুষের সলিল সমাধি হয়েছিল ইট বালু সিমেন্ট আর কংক্রিটের নিচে! রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সেই মাসুদ প্লাজার মালিক মাসুদ চৌধুরী সেই ১২০০ লাশ সহই ধ্বংসস্তুপকে মিশিয়ে দিয়েছিল মাটির সাথে, চাইলেই যাদের মাঝে অনেককে উদ্ধার করা যেত, জীবন্ত।
নরম, পবিত্র, আদি মাটির কবরটা পর্যন্ত নসীব হয়নি সেই মানুষগুলোর কপালে! সলিল সমাধি হয়েছিলো ইট কংক্রিটের জঞ্জালের নিচে!
কবর!
সেই মাসুদ প্লাজার ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে আরেকটি মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনা করে হয়েছিল। কাজ শুরু হবার একদিন পর আজ সকালে সেই স্থানে পাওয়া গেছে মাসুদ চৌধুরীর মৃতদেহ।
বহু বছর ধরেই লাপাত্তা ছিলো মাসুদ! সবাই জানতো সে লুকিয়ে আছে দুনিয়ার কোন না কোন কোণায়! আজ তাকে পাওয়া গেল ঠিক সেখানেই।
সমস্যা হচ্ছে, মাসুদের বিকৃত খন্ড বিখন্ড শরীরটাকে কোনমতেই রাস্তা থেকে ওঠানো যাচ্ছে না! ধরা মাত্রই মাংশগুলো গলে গলে মিশে যাচ্ছে মাটির সাথে! শতশত মানুষের চোখের সামনে কিছুক্ষণের মাঝে মাসুদের পুরো শরীরটা গলে মিশে গেল মাটির সাথে, চিরতরে!
অসংখ্য মানুষের ভয়ার্ত অবিশ্বাস মাখা চোখ, গুঞ্জন, ফিসফাস ছাপিয়ে ভেসে এলো একটা গলা,
“কবর তার বাসিন্দারে ঠিকই খুঁজে নিবে, সে এই জাহানের যে কোণায়ই থাকুক না কেন! কবরের ভয়াবহ আজাবও তার জন্য সুনিশ্চিত। হয়তো কখনো কখনো সেই আজাবের স্বাদ পাইতে হবে জীবন্ত থাকতেই!”
[সমাপ্ত]