দ্য হলি হেল
“ডরায়েন না চাচা। আইজ আপনার মরণ নাই।”
শিশিরের বলা কথাটা বৃদ্ধের কানে গেলো বলে মনে হলো না। সামনে থেকে ধেয়ে আসা মাইক্রোবাসটার দিকে তার নজর সেঁটে গেছে। মাইক্রোবাসটা অবশ্য তখন রাস্তায় নয়, শূন্যে!
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের এক পিলারের সাথে সজোরে ধাক্কা খেয়ে গাড়িটা যখন পরপর কয়েকটা পল্টি খেয়ে প্রবল বেগে ছুটে আসছিল শিশিরদের বসে থাকা রিকশাটার দিকে, শিশির তখনো ভাবলেশহীন চোখে নির্বিকার তাকিয়ে সেই ধাবমান মৃত্যুদূতের দিকে!
শিশির জানে এই গাড়িটার কোন আঁচ তার গায়ে এক বিন্দুও লাগবে না। এবং তার ভাবনা মতোই মাইক্রোবাসটা রীতিমতো তার রিকশার উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পেছনে আছড়ে পড়লো সগর্জনে। শিশিরের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগলো না।
কততম বারের মত হলো এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি?
একুশবার না?
“হু! আজই তো একুশ হলো।” বিড়বিড় করলো শিশির।
অটোরিকশায় ওর পাশের সীটে বসে থাকা ষাটোর্ধ্ব সেই বৃদ্ধ তখনো নির্বাক হয়ে সভয়ে তাকিয়ে আছেন পেছনের ওই ধ্বংসাবশেষের দিকে।
“চাচা, বললাম তো, ঘাবড়ায়েন না।”
শিশিরের ডাকে সম্বিৎ ফিরল লোকটার। ওর দিকে ঘুরে তাকাল। “কী বললা?”
“বললাম পেরেশান হইয়েন না চাচা। আমি আছি তো। মৃত্যু আপনারে আপাতত ছুঁইতে পারবে না, যতক্ষণ আমার সাথে আছেন।”
মুরুব্বি কোন উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শিশিরের দিকে। পেছন থেকে তুমুল হইচই শোনা যাচ্ছে। মুহূর্তের মাঝে শ'খানেক মানুষ জমে গেছে উল্টে যাওয়া মাইক্রোবাসটার চারদিকে। শিশিরদের রিকশাটা থেমে আছে রাস্তার পাশে।
“আমি হলাম গিয়ে, উমমম ধরেন একটা সুপারহিউম্যান। সুপারহিউম্যান কী জিনিস চিনেন? ব্যাটম্যান? সুপারম্যান?” বৃদ্ধের বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে থাকা দেখে শিশির বুঝলো তিনি এসব চেনেন না।
“সুপারহিউম্যান হলো যাদের অলৌকিক কোন ক্ষমতা থাকে। এই যেমন আমার।”
“তোমার অলৌকিক ক্ষমতা আছে?”
“জ্বী আছে। নিজের চোখেই তো দেখলেন।”
“কী ক্ষমতা? কী দেখলাম?” মুখ ভর্তি সাদা দাঁড়িতে কাঁপা হাতে একবার আঙুলগুলো বুলিয়ে আনলেন প্রৌঢ় মানুষটা।
“কী ক্ষমতা?” হাসলো শিশির। “ওই যে পেছনের মাইক্রোটা উল্টিয়ে পড়ে আছে দেখতেছেন না? ওইটা যেভাবে উল্টে গিয়ে আসতেছিল আমাদের রিকশার দিকে, একশো বারের মাঝে একশোবারই মাইক্রোবাসটার সরাসরি আমাদের এই রিকশার উপর এসে পড়ার কথা। কিন্তু পড়লো কই? বিশ হাত দূরে গিয়ে। আমাদের উপর পড়লো না। কেন পড়লো না বলেন তো?”
“কেন?”
“কারণ আমি আছি, তাই।” শিশিরের গলায় প্রচ্ছন্ন একটা অহংবোধ খেলে গেল।
“তুমি আছো তাই পড়ে নাই? কেন পড়বে না তুমি থাকলে? তুমি কী? কোন ফেরেশতা?” এবার একটু বিরক্তিমাখা গলায় কথাটা বললেন মুরুব্বি।
“কারণ আজকের দিনের জন্য আমি অমর। আজকে আমার কোন মৃত্যু নাই।” শিশিরে ঠোঁটের কোণে একটা ব্যঙ্গমিশ্রিত হাসির রেখা।
“তুমি অমর মানে কী?” ভদ্রলোকের গলার বিরক্তিভাব এবার রূপ নিল অবিশ্বাস আর বিষ্ময়ে।
“অমর মানে ইমমর্টাল। যার কোন শেষ নাই। যে কোনদিন মরবে না। আজকের যে ঘটনাটা দেখলেন ঠিক একই রকম ঘটনা আজকের আগে আরো বিশবার ঘটছে আমার সাথে। ও ভালো কথা, আজ কিন্তু আমার জন্মদিন। আমারে শুভেচ্ছা জানান মুরুব্বী।” বলতে বলতে একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে শিশির রিকশা থেকে নেমে রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
ওদের রিকশাওয়ালা রীতিমত ভীমড়ি খাওয়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে পেছনের দিকে। কিছুক্ষণ আগেই সাক্ষাৎ আজরাইল যেন উড়ে গেল তাদের উপর দিয়ে!
এদিকে প্রৌঢ় দুই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন শিশিরের দিকে।
“তোমার সাথে এর আগে এই ঘটনা আরো বিশবার ঘটেছে এইটুকু বলে ধুপ করে চলে গেলা তোমার জন্মদিনের কথায়! আগের কথা আগে শেষ কর! ওইটার সাথে তোমার জন্মদিন এর কী সম্পর্ক?”
“কারণ আজ আমার একুশতম জন্মদিন। আর যে ঘটনাটা ঘটতে দেখলেন সেইটা আজ নিয়া একুশবারই ঘটলো।” শিশির হেঁয়ালি মাখা গলায় জবাব দিল।
রিকশা থেকে নেমে দাঁড়ালেন এবার ভদ্রলোক। চোখমুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন শিশিরের দিকে। তার চোখের দৃষ্টি দেখে হাসলো শিশির।
“এত বকবক করতেছি আর আপনার নামটাই তো জানা হইলো না চাচা। আমি শিশির, আপনি?” একটা হাত এগিয়ে দিল শিশির করমর্দনের উদ্দেশ্যে।
বিশ একুশ বছরের একটা চ্যাংড়া ছেলে তাঁর মতো ষাট বছরের এক বুড়োর দিকে এভাবে হ্যান্ডশেইকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিবে এটাও বোধহয় ভাবেননি ভদ্রলোক। অনিচ্ছা সত্ত্বেও শিশিরের হাতটা ধরে আলতো ঝাঁকি দিয়ে ছেড়ে দিলেন।
“আমার নাম মালেক।”
“আজ আপনার লাকি ডে মালেক চাচা। কারণ আপনি আমার সাথে ছিলেন। তবে ওই মাইক্রোতে যে ছিল সে বোধহয় অত লাকি ছিলো না!” কৃত্রিম আফসোস ঝড়ে পড়লো শিশিরের গলা থেকে।
মালেক পেছনে তাকালেন। মাইক্রো থেকে একটা লাশের খন্ডবিখন্ড অংশ বের করে করে রাখা হচ্ছে রাস্তায়! মাইক্রোতে একজনই ছিল। মাইক্রোর ড্রাইভার। বেচারার পুরো শরীরটা ছিড়েখুঁড়ে কয় টুকরো হয়েছে সে হিসেব করতে গেলেও সারা শরীর গুলিয়ে আসছে!
মালেক আবার ফিরে তাকালেন শিশিরের দিকে। মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুলের শুকনো ছেলেটার চেহারাটা ভীষণ মায়াবী। কিন্তু ওর কথাবার্তা কেমন যেন!
“তখন কী বলছিলে? এই রকম ঘটনা মানে দূর্ঘটনা তোমার সাথে আজ নিয়ে একুশবার ঘটলো?”
শিশির উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে মালেকের কথায় সম্মতি জানালো।
“কিন্তু তখন বললে আজই তোমার একুশতম জন্মদিন? তার মানে কী প্রতি বছরই এমন ঘটনা একবার করে ঘটে তোমার সাথে?”
“এই তো! আপনে একদম ঠিকঠাক ধরেছেন। তবে এইখানে একটা ভীষণ চমৎকার কাহিনী আছে বুঝলেন চাচা। প্রতি বছর যেনতেন সময়ে এই ঘটনা ঘটে না। প্রতি বছর ঠিক আমার জন্মদিনের দিন ঘটে! আর আমার জন্মদিনের দিন আমি হচ্ছি অমর! দুনিয়া কেয়ামত হবে মাগার আমি শিশিরের একটা চুলও ছিঁড়বে না! ইন্টারেস্টিং না ব্যাপারটা?” শিশিরের চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে।
কী বলবেন বুঝে উঠতে পারলেন না মালেক। প্রশ্ন করলেন,
“জন্মের পরপরের ঘটনা তো আর তোমার মনে থাকার কথা না! তাহলে তখনকার সময়েও এমন ঘটনা ঘটেছিল? তোমার বাবা মা বলেছেন তোমাকে?”
“আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান লোক মালেক চাচা। ধরেছেন ঠিক। আমার জন্ম হইছিল বাবা মায়ের বিবাহের প্রায় বারো বছর পর। আমার আম্মার কাছে শুনছিলাম আমার বাবা এমন কোন ডাক্তার কবিরাজ হুজুর মাজার পীর কোন কিছুই বাদ দেন নাই একটা সন্তানের জন্য। ডাক্তার বলে দিয়েছিলো, সমস্যাটা আমার বাবারই ছিল। কিন্তু সব জাইনাও একটা ছেলের জন্য তিনি প্রায় পাগল পাগল হয়ে গেছিলেন। একটা সন্তানের প্রতীক্ষায় যখন তার অবস্থা উন্মাদ প্রায় ঠিক তখন মা তারে দিছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। আমি মায়ের গর্ভে এই খবর পাবার পর পুরা গ্রামের সবাইরে মিষ্টিমুখ করাইছিলেন বাবা। তারপর… যেদিন আমার জন্ম হয় সেদিন নাকী ওই হাসপাতালে একই সময়ে আরেকটা বাচ্চারও জন্ম হইছিল। আমি আর ওই বাচ্চাটারে নাকী পাশাপাশি দুইটা বেডে শোয়ায়ে রাখছিল এনআইসিইউ তে। পরে কী হইলো জানেন? ঠিক আমাদের মাথার উপরের সিলিং থেকে বন্ধ ফ্যানটা নাকী হুট করে খুলে পড়ে গেল নিচে। একদম আমাদের দুজনের শরীর বরাবর। মজার কথা কী জানেন ফ্যানটা সোজা আমার দিকে পড়তে নিয়েও নাকী শেষ মুহূর্তে আমার ছোট্ট শরীরটা পড়ছিল ফ্যানের দুইটা পাখার মাঝের ফাঁকা অংশে। আর ফ্যানের গোলাকার ধাতব বডিটা আলাদা হয়ে গিয়া পড়ছিল সোজা ওই পাশের বাচ্চার উপর। এইটুকুন শরীর বাচ্চাটার… এক্কেবারে ভর্তা! জায়গার মধ্যে শেষ!”
মালেক যেন শিউরে উঠলেন একটু শিশিরের ভাবলেশহীন গলা শুনে।
শিশির বলে চললো,
“এইটা তো মায়ের থেকে শোনা কাহিনী। এরপর যেদিন বয়স এক হইল সেদিন বাসায় আগুন লাগলো। বাড়িতে আমার নানী ছাড়া কেউ ছিলো না। আমারে বাঁচাইতে গিয়া নানী আগুনে পুইড়া কয়লা হয়ে গেল কিন্তু আমারে ঠিকই বাঁচায়ে রাইখা গেল। আগুনের তাপটাও লাগে নাই শরীরে। এরপর বছর দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয় প্রতি বছর জন্মদিনের দিনই কোন না কোন এইরকম ভয়ংকর দূর্ঘটনায় পড়ছিল। আর আমার কিচ্ছুই হয় নাই। ওইগুলা আমার মনে নাই। তবে বয়স যখন সাত হইলো তখন থেকে এই আজ পর্যন্ত যতগুলা ঘটনা ঘটছে সবগুলা মনে আছে বুঝলেন।”
শিশির থামলো। তার চোখেমুখে একটা উত্তেজনা। যেন অনেকদিন পর কারো সাথে মন খুলে কথা বলতে পারছে সে।
“সাত বছরের সময় কী হইছিল?” মালেক প্রশ্ন করল।
“সাত বছরের জন্মদিনের দিন? তখন সবে ক্লাস টু-তে ভর্তি হইছি। স্কুলের ভ্যান বাসা থেকে নিয়া যায়, আবার ছুটি হইলে বাসায় নামায়ে দিয়া যায়। সেদিন আমিই ছিলাম ভ্যানের শেষ ছাত্র। ভ্যানওয়ালা ছেলেটা একটু তাড়াহুড়ো করেই ভ্যানটা চালাইতেছিল। আমারে বাসায় নামায়ে দিলেই তার ডিউটি শেষ। কিন্তু বিধি বাম। মূল সড়ক থেকে গলিতে নামতেই ভ্যানটা পড়ল এক রড বোঝাই ট্রাকের সামনে। ট্রাক ড্রাইভার অনেক কসরত করেছিল ট্রাক থামানোর। ট্রাক থেমেছিল ঠিকই তবে রডের দুইটা লম্বা লম্বা বান্ডেল উইরা আসছিল সোজা ভ্যানের দিকে। আমার চোখের সামনে দিয়া একগাদা রড সাঁই সাঁই করে উড়ে গিয়া ভ্যান ড্রাইভারের ঘাড় দিয়া ঢুইকা একদম খুলি ছ্যাঁদা করে বাইর হয়ে গেছিল দুইটা রড অথচ আমার শরীরে একটা আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি! সেই দিন থেকে সব মনে রাখা শুরু! স্কুলে থাকা অবস্থায় এক বছরে একবার ট্রাকের নিচে পড়ে গেছিলাম বন্ধুর বাইকের পেছনে বসা অবস্থায়। বন্ধুর মাথার উপর দিয়ে বাসের চাক্কা চলে গিয়েছিল, হেলমেট থেকে মগজ চেঁছেও আলাদা করার উপায় ছিলো না আর আমার হাত পা কোথাও ছিঁলে পর্যন্ত যায়নি। এরকম আরো গাঁদাখানেক ঘটনা আছে প্রতি বছর মিলায়ে হিসাব করলে। আর সবই এই আমার জন্মদিনের দিন। বুঝলেন চাচা?”
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,“হতে পারে তুমি ভাগ্যবান। প্রচন্ড ভাগ্যবান। কাকতালীয় ভাবে প্রতিবার তুমি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে আসছো।”
“ভাগ্য এতবার সহায়তা করে চাচা? তাও আবার বাইছা বাইছা আমার জন্মদিনের সময়ই? অসম্ভব। এইটা ভাগ্য না।”
“তাহলে? কী এটা?”
“ওই যে বললাম। আমি অমর। এই দিনে আমার কোন মৃত্যু নাই।”
“অমর তো শুধু সৃষ্টিকর্তা হয়। তুমি কী নিজেকে সৃষ্টিকর্তার সমান কেই ভাবতেছো শিশির?” মালেক অস্ফুট গলায় প্রশ্ন করলেন।
“অবশ্যই চাচা। আজকের দিনের জন্য আমি সৃষ্টিকর্তার চেয়েও উপরের কেউ, হাহাহা! আজ প্রথমবার আমার মনে হচ্ছে আমিই ইশ্বর! আজই প্রথমবার!” শিশিরের চোখেমুখে অপ্রকৃতস্থ একটা হাসি দেখে মালেক নিশ্চুপ হয়ে গেলেন!
প্রকৃতি কত বিচিত্র!
ভাগ্য কতই অদ্ভুত!
সন্ধ্যা হয় হয়। শিশির আর মালেক দুজনই দাঁড়িয়ে আছেন বাসের জন্য। তখন রিকশা থেকে এইখানে এসেই নামতেন দু'জনে। তারপর বাসে করে তাদের যাত্রা করার কথা নিজ নিজ গন্তব্যে। মাঝে ওই মাইক্রোবাস দূর্ঘটনার পর প্রায় ঘন্টাখানেক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন দু’ জনে। এতক্ষনে বাসে ওঠার কথা মনে পড়েছে তাদের।
“দেরী হয়ে গেলো না চাচা আপনের? আমার এই গল্প শুনতে শুনতে?”
“নাহ। এমন গল্প শুনতে গিয়ে কখনো দেরী অনুভব করা সম্ভব?” হাসলেন মালেক। শিশিরও হাসলো। অনেকদিন পর বুকের গভীরে চেপে রাখা কথাগুলো কাউকে বলতে পেরেছে।
“বাস এত লেট করতেসে আজকে!” শিশির বারকয়েক উঁকিঝুঁকি মারলো রাস্তার মাঝে গিয়ে।
“ওই তো আসছে একটা। সাইডে এসে পড়।” দূর থেকে ধীর গতিতে আসা একটা বাস দেখিয়ে বললেন মালেক।
কিছুক্ষণ এর মাঝে বাসটা ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো। মালেক বাসে উঠে পড়লেন আগে। পেছন পেছনে উঠলো শিশির। বাসের ভেতরটা অন্ধকার। লাইট জালায়নি ড্রাইভার।
একদম সামনের দিকের দুটো সীটই খালি আছে শুধুমাত্র। আর সব সীটে মানুষ। যেন ওদের দুজনের জন্যই সীট দুটো খালি ছিল।
বাসটায় ওঠার পর থেকেই শিশিরের কেমন যেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। শীত শীত করছে তার। অথচ বাইরে বেশ গরম। বাসের ভেতর এত ঠান্ডা কেন? এসি বাস নাকী তাও বুঝতে পারছে না অন্ধকারে। এই রুটে সব লোকাল বাস চলে। এসি বাস আসার কোন চান্সই তো নেই।
“কী হলো? বসবা না সীটে? দাড়িয়ে যাবা?” মালেক শিশিরকে ডাকলো পাশের সীটে বসার জন্য।
শিশির দোদুল্যমান মনে সীটে বসে পড়ল। ও বসার সাথে সাথে বাসটা চলতে শুরু করলো।
এত বিশাল একটা বাস। পুরো বাসের সবগুলো সীট ভর্তি মানুষ। তাও বিন্দুমাত্র শব্দ নেই। সবাই কী ঘুম? অন্য সময়ে তো কোন বাসেই পা রাখার জায়গা পায় না। বাসের হেল্পারকে আবছা দেখা যাচ্ছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির মত স্থীর হয়ে। ভাড়ার জন্য এসে হাঁকডাক করার বদলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে কেন লোকটা?
“শিশির?” মালেকের ডাকে চিন্তার সূতো কেটে গেল শিশিরের।
“বলেন চাচা।”
“তোমার ঘটনাটা আমাকে প্রচন্ডরকম অবাক করেছে জানো। এও কী সম্ভব?”
শিশির হাসলো। “আপনে নিজের চোখে প্রমাণ পাইছেন না? আর কী কমু আমি? আর কিছু ঘটনা থাকে যা ব্যাখ্যার অতীত। ধইরা নেন আমার থেকে আপনি অমনই একটা ঘটনা শুনছেন!”
“আমিও একটা ঘটনা জানি। অনেকটা এমন। শুনবা? তবে তার আগে একটা কথা বল তো আবার। তুমি কি বিশ্বাস কর তুমিই আজ ইশ্বর? খোদা?” মালেকের গলার স্বর কেমন যেন লাগলো লাগলো শিশিরের।
“এটা কেমন প্রশ্ন হইলো চাচা?”
“আহা, জবাব দাও না। হা কীংবা না।”
“অবশ্যই হ্যাঁ! আমি বিশ্বাস করি আজ আমি ইশ্বরের চেয়েও বড় কেউ চাচা। আগেও বলছি। আবারো বললাম। আমিই ইশ্বর। আমিই খোদা, অন্তত আজকের চব্বিশ ঘন্টা। আপনি আপনার ঘটনাটা বলেন তো। শুনবো। বলেন!”
“আচ্ছা।” মালেক মৃদু হাসলেন। ”ঠিক আছে তবে, শোনো। আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা। প্রায় দুই যুগ। একজন মানুষ খুব করে একটা জিনিস পাবার জন্য সৃষ্টিকর্তার দরবারে কান্নার রোল বইয়ে দিয়েছিল। বছরের পর বছর সে মাথা ঠুকেই যাচ্ছিল, ঠুকেই যাচ্ছিল সেই পরম আরাধ্য জিনিস পাবার জন্য। কিন্তু স্রষ্টার কোন মর্জি ছিলো না তাকে সেই জিনিসটা দেবার। তখন সে কী করলো জানো?”
“কী?”
“সেই মানুষটা সব আশা হারিয়ে স্বয়ং স্রষ্টারই বিরূদ্ধে চলে গেল। সে এমন একজনের কাছে গেল যাকে সৃষ্টিকর্তা অনন্তকালের জন্য অভিশপ্ত করে রেখেছেন। যে জিনিস মানুষটা স্রষ্টার দরবারে পায়নি সেই একই জিনিস সে চেয়ে বসলো স্রষ্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা সেই অভিশপ্ত অস্তিত্বের কাছে! বিনিময়ে সেই অভিশপ্ত কায়া যা চায় তাই দেয়ার জন্য সে রাজী হয়ে গেল। সে কী কাজটা ঠিক করেছিল শিশির?”
“স্রষ্টা যদি তাকে তার আরাধ্য স্বপ্ন পূরণ করে না দেয় তবে অবশ্যই সে ঠিক করেছে যার কাছে গিয়েছে। সে হোক অভিশপ্ত। তার প্রাপ্য সে বুঝে পেলেই হলো।” শিশির জোর গলায় উত্তর দিল।
“সে পাবার জন্য যদি ইশ্বরের বিরূদ্ধে যেতে হয় তাও?”
“তাও। অবশ্যই বিরূদ্ধে যাবে। কেন যাবে না?” শিশিরের প্রশ্নে মৃদু হাসলো মালেক।
“তবে ইশ্বর তার সৃষ্টির প্রতি সব সময় দয়ালু। তিনি তার এক দূত পাঠালেন সেই পাগলপ্রায় মানুষটার কাছে। তাকে জানালেন যদি সে স্রষ্টার বিরূদ্ধে যায়, সে যা চায় তা পেলেও সেটা পাওয়া মাত্র বিনাশ করা হবে। জন্ম লগ্নেই তার ধ্বংস ঘটবে। এই বার্তা মানুষটা পৌছে দিল সেই নিষিদ্ধ, অভিশপ্ত কায়ার কাছে। সেই কায়া মানুষটাকে একটা উপায় বাতলে দিল। যদি মানুষটা তাতে রাজী হয় তবেই ইশ্বরের কথাকে ভুল প্রমাণ করে ছাড়বে সে। নাছোরবান্দা মানুষটা মুহূর্তের মাঝে রাজি হয়ে গেল সেই শর্তে। তবে সে উপেক্ষা করে গেলো ভয়ংকর এক সতর্কবানীকে। এক ক্ষমাহীন পাপকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হল। যে পাপ কোন ভাবে একবার ঘটে গেলে সেই মানুষ, তার আরাধ্য স্বপ্ন সব কিছুর উপর নরকের সহস্র খোলা দরজা দিয়ে নেমে আসবে ভয়ংকর এক তান্ডব!”
শিশির অনুভব করল তার পিঠ বেয়ে ঠান্ডা ঘামের কয়েকটা সরু রেখা নিচের দিকে নামছে। কিছু একটা তার খুব পরিচিত লাগছে। কী যেন একটা তার একদম চোখের সামনে ঘুরঘুর করছে! ধরতে পারছে না!
“কী ছিল সেই শর্ত? আর… সেই সতর্কবানী? নরকের দরজা খুলে দেয়ার মত কোন অপরাধ?” ফিসফিস করল শিশির। তার কথা শেষ হবার সাথে সাথে দপ করে লাল একটা আলো জ্বলে উঠলো বাসের ভেতর। শিশির চমকে উঠে দেখলো তার পাশে বসে থাকা মালেক সাহেব এখন আর তার পাশে নেই। মুহূর্তের মাঝে তিনি যেন অন্য কোথাও চলে গেছেন!
লালচে আলোয় প্রথম যেটা শিশিরের চোখে পড়ল… সেটা হলো সামনে দাঁড়ানো সেই মূর্তির মতো হেল্পারটার চেহারা!
“বাবা…!” স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইল শিশির তার বাবার দিকে! হঠাৎই গমগমে এক গলার আওয়াজে কানে তালা লেগে যেন তার।
“সেই শর্ত ছিল… জীবনের বদলে অন্য জীবন। অপবিত্র এক আত্মার বদলে পবিত্র আত্মা। যেই শুদ্ধ আত্মাদের কথা ছিল এই ধরায় বেঁচে থাকার, সেই শুদ্ধ পবিত্র আত্মাদের বলির বিনিময়ে টিকে থাকতো সেই পাগলাটে মানুষটা অর্থাৎ তোমার বাবার মহা আরাধ্য বস্তু… এক অশুভ অপবিত্র আত্মা… তুমি!”
শিশিরের সারা শরীর যেন জমে গেল বরফের মতো! তার বিস্ফোরিত দুই চোখ পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে দেখতে লাগলো তার বাবার শরীরটা হঠাৎ একটা ধনুকের মতো দুমড়ে মুচড়ে বাঁকা হয়ে যাওয়া!
কেউ যেন নরম কাপড়ের মত করে তার বাবার শরীরটাকে ধরে অবলীলায় অনবরত মোচড়াচ্ছে! মুহুর্তের মাঝে গলার হাড়টা ভেঙে মাংস চামড়া ছিঁড়ে বাইরে বেরিয়ে এল তার। মাথাটা মুচড়ে মুচড়ে গোল গোল ঘুরতে থাকলো ঠিক একটা লাটিমের মত! সেই ঘূর্ণনগতির তীব্রতায় দুই চোখ, দাঁত, কান, গালের মাংস সব কিছু একের পর ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে লাগলো চারপাশে। কিছুক্ষণের মাঝে শরীরের সব হাড় মাংস থেকে ভেঙে আলগা করে আলাদা করে ফেলা হলো! তারপর হুট করেই যেন পায়ের নিচের বাসের মেঝে ফাঁক হয়ে গেল দু'পাশে। দুটো কুচকুচে কালো হাত সাপের মত এঁকেবেঁকে বেরিয়ে এসে শিশিরের বাবার পুরো শরীরটা একের পর এক প্যাচ দিয়ে ধরে এক টানে নিয়ে গেল মাটির নিচে… লকলকে আগুনের শিখার মাঝে!
শিশির পুরোটা সময় পাথরের মূর্তির মত বসে বসে দেখেছে তার বাবার সাথে হওয়া ওই নারকীয়তা!
হঠাৎ বাসের পেছনের পিনপতন নিরবতা ভেঙে পেছন থেকে ভেসে আসতে লাগলো অপার্থিব কিছু শব্দ!
ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরাল শিশির। প্রথম চোখ পড়ল তার ঠিক পেছনের সীটে।
একটা নবজাতক বাচ্চার শরীর। পুরো শরীরটা থেঁতলে আছে একটা লোহার ফ্যানের নিচে চাপা পড়ে! পেট পিঠ এক সাথে লেগে সমান হয়ে গেছে ভারী ফ্যানের ওজন সহ্য করতে না পেরে।
তার পাশের সীটে বসে আছে পোড়া, কুচকুচে কালো একটা মাংসের পিন্ড। যার আকৃতি একটা মানুষের মত। শিশির জানে এটা কে!
সে জানে এরা কারা!
ওই মাথা পিষে যাওয়া তার বন্ধুর শরীর? গলা আর মাথায় ছিদ্র হওয়া সেই ভ্যান ড্রাইভারটা ওটা?
কয়েক শো টুকরো মাংস ওই সীটটায় পড়ে আছে… একটু আগের মাইক্রো ড্রাইভার?
শিশির জানে এই বাসে সে ছাড়া আরো একুশজন আছে ওই সীটগুলোতে! কানে ভেসে এলো মালেকের গমগমে গলা…
“এদের কারো কপালেই মৃত্যু লেখা ছিলো না। মৃত্যু লেখা ছিল শুধু একজনের। তোমার। তোমার মৃত্যু লেখা ছিল তোমার জন্মের পরমুহূর্তে থেকেই শিশির। তোমার বাবা তোমায় সৃষ্টির নিয়মের বিরূদ্ধে গিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে এতদিন। প্রতিটা জন্ম দিবসই ছিল তোমার মৃত্যু দিবস… তোমার নিয়তির লেখা সেটাই। কিন্তু সেই অপবিত্র শর্তে তুমি এতদিন বেঁচে ছিলে এই পবিত্র আত্মাগুলোর বিনিময়ে। হয়তো আরো থাকতে যদি সেই নিষিদ্ধ পাপটা না করতে। যার সতর্কবার্তা তোমার বাবা শুনতে চায়নি… সেটাই আজ তোমায় তোমার পাওনা ফিরিয়ে দিতে এসেছে।”
শিশির অনুভব করলো, বাসের পেছনের ওই একুশটা বিকৃত, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন জীবন্মৃত মানুষগুলো ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে গোল হয়ে একটা বৃত্ত তৈরী করছে। মালেকের গলা কানে আসছে আবারো।
মালেক তাহলে…কে?
মালেক-উল-মউত?
উত্তর খোঁজার কোন সময় পেলো না শিশির।
“সেই পাপ? কোন সেই পাপ তা তুমি জানো শিশির। তোমার এই দুনিয়ায় কোন অস্তিত্বই থাকার কথা ছিলো না। তোমার জন্মই একটা অনর্থ। তোমার সৃষ্টিই স্রষ্টার বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে হয়েছে। আর তোমার পাপ হচ্ছে… তুমি নিজেকে সেই ইশ্বরের স্থানে বসিয়ে নিজেকে ইশ্বর বলে ঘোষণা দিয়েছ। মনে প্রাণে বিশ্বাস করে নিয়েছো তুমিই স্রষ্টা! এই একটা মহাপাপই তোমায় তোমার জন্য নির্ধারিত একমাত্র স্থানে নিয়ে যাবে। নরকের নিকৃষ্টতম স্তরে…!”
শেষ কথাগুলো কানে যায়নি শিশিরের।
তার পুরো শরীরটা একুশটা মানবাকৃতির জোঁক কামড়ে ধরেছে। রক্ত শেষ করে এখন মাংস শুষে নিচ্ছে। তারপর হাড়, চামড়া আর আত্মা!
কিছুক্ষণের মাঝে এই ধরা থেকে চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে অনাহূত এক মহা অপবিত্র সৃষ্টি। স্রষ্টার সামনে আরেকবার নত হবে… সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড।।।
[সমাপ্ত]