যন্ত্র
ব্যাপারটা একটু জটিল, তবে তারপরেও আপনাদের বুঝতেই হবে...
এটা একটা সতর্কবার্তা, দয়া করে মন দিয়ে পড়ুন।
হয়তো আপনি ‘ভবিষ্যৎ বলার যন্ত্র’র ব্যাপারে শুনেছেন। এই লেখাটা যখন আপনি পড়ছেন ততক্ষণে সম্ভবত ওটার বিক্রির পরিমাণ কয়েক কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
যারা এখনও ওটার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল নন, তাদের বলছি, ওটা একটা ছোট্ট যন্ত্র, যা দেখতে গাড়ির দরজা খোলার রিমোটের মতো। ওতে শুধু একটা বড় বাটন আর সবুজ রঙয়ের একটা এলইডি পর্দা রয়েছে। আপনি বাটনটা টিপে দেওয়ার সাথে সাথে সবুজ একটা আলো জ্বলে উঠবে পর্দাতে... নাহ ঠিক তা নয়, আলোটা জ্বলবে টেপার ঠিক এক সেকেন্ড আগে।
বেশিরভাগ মানুষই বলেছে যে যন্ত্রটা প্রথম প্রথম ব্যবহার করার সময় মনে হয় যেন তারা অদ্ভুত একটা খেলা খেলছে। যে খেলার উদ্দেশ্য- আলো দেখার পর বাটনটা টেপা। অদ্ভুত হলেও সত্য যে ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। ধরুন আপনি চাইলেন যে আলোটা দেখার আগেই বাটনটা টিপবেন, কিন্তু আপনি যতো তাড়াতাড়িই করুন না কেন… আলোটা ঠিক এক সেকেন্ড আগেই আসবে।
আবার আপনি অপেক্ষা করছেন, যন্ত্রটার দিকে তাকিয়ে, হয়তো আলোটা জ্বলে উঠবে, তারপর আপনি টিপবেন। কিন্তু আলো জীবনেও জ্বলবে না! আপনি টেপার জন্য আঙ্গুল আগাবেন, তার এক সেকেন্ড আগেই ওটা জ্বলবে। আপনি যদি আঙ্গুল এগিয়ে না টিপে আবার ফিরিয়ে আনেন তাহলেও আলো জ্বলবে না!
কোনভাবেই এটার পরিবর্তন হবে না! আপনি এই যন্ত্রটাকে কোনমতেই নিয়মের বাইরে আনতে পারবেন না।
এই যন্ত্রটার মূল উপাদান হলো একটা সার্কিট, যেটা সময়কে পিছনে ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে। এই সার্কিটটা সরাসরি অতীত এবং ভবিষ্যতে সিগন্যাল পাঠায়। এক সেকেন্ড এক সেকেন্ড করে করে এটা আপনাকে সময়কে আগে বা পিছে নিয়ে যেতে থাকে। তবে এই ব্যাপার নিয়ে কিন্তু আমি আপনাদের সতর্ক করছি না! এটা তো বেশ মজাই, তাই না?
সমস্যা হলো এই যন্ত্রটা আমাদের বুঝিয়ে দেয় ‘স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি’ বলে আসলে কিছুই নেই!
বেশ আগে থেকেই অনেক বিজ্ঞানী দাবী করে আসছেন যে এই জগতের কোন প্রাণীরই ইচ্ছার কোন স্বাধীনতা নেই, ব্যাপারটা পুরোটাই একটা বিভ্রম। কেউ পদার্থবিজ্ঞানের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন তো কেউ যুক্তির সাহায্যে। যুগের পর যুগ মানুষ ওই যুক্তিগুলোর অকাট্যতা খন্ডন করতে পারেনি, কিন্তু তারপরেও কেউই স্বীকার করেনি যে তাদের নিজের ইচ্ছার কোন দাম নেই। মানবেই বা কেন? ওই যুক্তি আর তত্ত্বগুলোর ব্যবহারিক প্রমাণ তো কেউ দেখাতে পারেনি।
এতোদিন পর সেটাই দেখাচ্ছে এই যন্ত্রটা।
সাধারণত কেনার প্রথম কয়েক সপ্তাহ ধরে মানুষ এটা নিয়ে খুব নাড়েচাড়ে, দিনের শেষে এটা তো ভবিষ্যত সম্পর্কে জ্ঞান দিতে পারে, তাই না? সে নিজের বন্ধুদেরকে এটা দেখায়, মজা পায়। তারপর একটা সময়ে এটার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়। কিন্তু কেউ কখনোই এটার গুরত্ব ভুলতে পারে না! মানুষ হতাশায় ডুবে যায়, তারা ভয় পেতে থাকে অপরিবর্তনীয় ভবিষ্যতকে। তারা বুঝতে পারে যে ভবিষ্যতের এই মহান ক্ষমতার সামনে তাদের কিছুই করার নেই, কারণ যা হওয়ার তা হবেই!
মানুষ বুঝতে পারে যে তাদের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কোন দাম নেই!
তারপর তারা আর কোনকিছুতেই নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করে না। ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। কারণ ওই যন্ত্রটা তাদের মস্তিষ্ককে বুঝিয়ে দিয়েছে, “তোমার ইচ্ছা বা অনিচ্ছা মূল্যহীন!”
যারা যারাই ওই যন্ত্রটা ব্যবহার করে তাদের এক তৃতীয়াংশকেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, কারণ তারা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে দূর্বল হয়ে পড়ে। যেটা আসলে ‘একাইনেটিক মিউটিজম’র শেষ পর্যায়। এই অসুখটাকে ডাক্তারেরা মজা করে ‘চলন্ত কোমা’ বলে থাকেন।
কোমাতে চলে যাওয়া রোগীদের মতো এই রোগের রোগীরা চেতনাহীন হয় না, তবে তারা চুপচাপ শুধু বসে থাকে, কোন কিছুই করে না! তাদের শরীরে শক্তি থাকে কিন্তু ইচ্ছাশক্তি আর থাকে না!
শরীরের শুধু একটা জিনিসকেই নড়ায় তারা আর তা হলো চোখের মনি। সেটাও অনেকক্ষণ পর পর।
এই জটিল মানসিক সমস্যাটি আগে খুবই কম মানুষের মধ্যে দেখা যেতো, তবে এই যন্ত্রটি আসার পর থেকে সবকিছু বদলে গেছে। ইউরোপে যেভাবে মধ্যযুগে প্লেগ ছড়িয়েছিলো ঠিক সেভাবেই অসুখটি ছড়িয়ে পড়ছে!
ভবিষ্যতকে জানার পর মানুষ যেন কোন এক অজানা আতংকের সাগরে ভেসে যাচ্ছে, কারণ দিনের শেষে তো তাদের কিছুই করার নেই! এই পৃথিবীতে মানুষ কাজ কেন করে? একটা নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য, কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ যদি আপনি জেনেই যান, তাহলে? আর যদি এটাও জেনে যান যে ওতে আপনার কিছুই করার নেই! আপনার ইচ্ছার কোন দামই নেই! তখন?
মানুষগুলো যেন মহাজাগতিক অজানা ভয়ের জগতে হারিয়ে যাচ্ছে, যে ভয়ের কোন শেষ নেই! মানুষের আসলেই কোন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই, এই ব্যাপারটা তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করার ফলেই ক্ষতিটা হচ্ছে। যদিও এই ব্যাপারটা আগেই অনেক বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছিলেন কিন্তু সম্ভবত তাঁরাও এটা মন থেকে বিশ্বাস করেননি! আর সেজন্যই সম্ভবত উনারা সুস্থ ছিলেন।
এই অসুখটার কয়েকটা পর্যায় আছে। প্রথম দিকে রোগীরা কাজ কর্ম ছেড়ে দিলেও কথাবার্তা বলে, তবে বেশ উদাসীনভাবে।
এই পর্যায়ে থাকা রোগীদের নিয়েও কাজ করেছেন ডাক্তারেরা, কিন্তু তাঁরা সফল হতে পারেননি।
যেমন ধরুন একজন ডাক্তার একবার এক রোগীকে বলেছিলেন, “দেখুন আমরা এতোদিন বেশ সুন্দরভাবেই জীবনযাপন করছিলাম, এটা ভেবেই যে আমরা আমাদের ইচ্ছামতো চলি! আমাদের ইচ্ছাশক্তির মূল্য আছে, কিন্তু তখনও আসলে আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ছিলো না। তো? তখন যদি আপনি খুশি থাকতে পারেন তবে এখন কেন নয়? যে জিনিসটা ছিলোই না, সেটা অনস্তিত্ব প্রমাণ হওয়ার পর কেন আপনাকে অসুস্থ হতে হবে?”
চুপচাপ পাঁচ মিনিট বসে ছিলো রোগী লোকটা, এবং তারপর বেশ উদাসীনভাবে সে উত্তর দিয়েছিলো, “কিন্তু এখন আমি সত্য জানি! আমার ইচ্ছার কোন মূল্য নেই!”
ডাক্তার আর কিছুই বলার সাহস পাননি তাকে।
অনেকে এটাও বলতে পারেন যে যন্ত্রটা ব্যবহার করেই যেহেতু মানুষ অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে তার মানে হয়তো আমাদের নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি আছে। নইলে তারা জিনিসটাকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলো কী করে? আর যেখানে মাত্র এক তৃতীয়াংশ মানুষ অসুস্থ হয়েছে, তাতেই কি প্রমাণ হয়ে যায় না যে তারা নিজেরাই নিজেদের অজান্তে ‘অসুস্থ হওয়া’ ব্যাপারটাকে বেছে নিয়েছে, কারণ বাকিরা তো অসুস্থ হয়নি, তার মানে তারা সুস্থ থাকতেই চেয়েছে, তাই না?
এই দিয়ে উনারা প্রমাণ করতে চাইবেন যে মানুষের নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি আছে।
এটা যদি আপনি বিশ্বাস করেন তবে ভুল করবেন। কারণ মানুষের প্রতিটি অনূভুতিরই গুরত্ব আছে। একটা নতুন ব্যাপারে খুব বেশী অনুভূতিশীল মানুষেরা অনেক বেশী অনুভূতি প্রকাশ করবেন, কারণ তাদের মস্তিষ্ক অনেক তাড়াতাড়ি কাজ করে, কিন্তু যাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে কাজ করে তাদেরটা অতো তাড়াতাড়ি কোন অনুভূতি দেখাবে না।
কিন্তু একটা সময়ে ওই মস্তিষ্কগুলোও আক্রান্ত হবে।
মনে করুন দুটো তাপগতিবিদ্যার সিস্টেমকে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে বলা হলো। একটা সিস্টেম ঠিকঠাক মতো চলে গেলো একটা কাজ শেষ করে থেমে গেলো, আরেকটা কাজ তো করলোই না বরং শুরুতেই গোলযোগ দেখা দিলো এবং শুরু হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর সেটা কাজ শুরু করলো, এবং শেষে গিয়ে সেটা ভালো ফলাফল দিলো না।
যারা কোন অনুভূতি দেখাচ্ছে না, মানে সুস্থ আছে বলে মনে হচ্ছে তাদের ব্যাপারটাও ঠিক এমনই। তাদের অবস্থা ওই দ্বিতীয় সিস্টেমটার মতো আরও বেশী খারাপ হবে।
এই বার্তাটি আমি পাঠাচ্ছি আপনাদের সময়ের ঠিক এক বছর পরের ভবিষ্যৎ থেকে। ভবিষ্যতে এই যন্ত্রগুলোতে বার্তা পাঠানোর সুবিধাও যুক্ত হয়েছে যাতে করে অতীত আর ভবিষ্যতে বার্তা পাঠানো যায়। সম্ভবত আমিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘতম বার্তাটি পাঠাচ্ছি। আমার মতো আরও অনেকেই বার্তা পাঠাচ্ছে আপনাদের জন্য, তবে আমারটাই সম্ভবত সবার আগে পৌছবে। ওদের বার্তাগুলো আমার মতো এতো গুরত্বপূর্ণ হবে বলেও মনে হয় না।
যাইহোক আপনাদের উদ্দেশ্যে আমার পরামর্শ হলো, ‘এমন একটা ভাব ধরুন যেন আপনার ইচ্ছার মূল্য আছে। সোজা ভাষাতে বলি, অভিনয় করুন। কারণ এতে করে আপনার সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। যদিও আপনি সত্যটা জেনে গেছেন যে আসলেই এই জগতের কারও কোন ইচ্ছারই মূল্য নেই। তারপরেও সত্যকে দূরে রেখেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন। সত্যের চাইতেও আপনার কাছে আপনার বিশ্বাসের মূল্য বেশী হওয়া উচিত। আপনাদের বিশ্বাসের ওপরেই মানবসভ্যতা নির্ভর করছে, চিরকালই ব্যাপারটা এমন!
কিন্তু তারপরেও, এটা বহু আগে থেকেই ঠিক করা আছে যে কে অসুস্থ হবে আর কে হবে না। এভাবে বললে আসলে আপনাদের বিশ্বাসেরও কোন মূল্য নেই, ইচ্ছার তো নেইই। আপনি ওই যন্ত্রটাকে বেছে নেন না বরং ওই যন্ত্রটা আপনাকে বেছে নেয়।
আর আমার পাঠানো এই বার্তাও কোন পরিবর্তন আনতে পারবে না আপনাদের ওপর। কিন্তু তারপরেও কেন আমি এই বার্তাটি পাঠাচ্ছি?
কারণ আমাকে এটা পাঠাতেই হতো, আমার আর কোন উপায় ছিলো না.... এটা আমার ইচ্ছাতে হয়নি! আমাদের কারও ইচ্ছাতেই কিছু হয় না!
-সমাপ্ত-
মূল নাম- হোয়াটস একসেপ্টেড অফ আস